বিশ্ব

মুসলিম ভোটের অঙ্ক কতটা প্রভাব ফেলবে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে

মোট প্রায় ১০০টিরও বেশি আসনে মুসলিম ভোট গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ফলে এই ভোটব্যাংকে সামান্য পরিবর্তনও বড় রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।

  • 11:22 pm - March 25, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৫ বার
পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ভোটার। ফাইল ছবি

মেলবোর্ন, ২৫ মার্চ- ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্ক ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর সেই জটিলতা আরও বেড়েছে। ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া, লক্ষাধিক ভোটারের পরিচয় ‘বিচারাধীন’ অবস্থায় থাকা, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলিতে এই অনিশ্চয়তার ঘনত্ব বেশি হওয়া এবং একই সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক জোট ও নেতৃত্বের আবির্ভাব—সব মিলিয়ে মুসলিম ভোট এবার কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

নির্বাচন কমিশন বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে রাজ্যে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষেরও বেশি। কিন্তু প্রাথমিক খসড়া তালিকা প্রকাশের সময়ই প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ে যায়। পরে সংশোধন প্রক্রিয়া শেষে আরও প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২ জন ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।

এর পাশাপাশি আরও ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটারের পরিচয় এখনো বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে। তাদের নামের পাশে ‘বিচারাধীন’ উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই ভোটারদের নথিপত্র যাচাই করে পরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে নতুন করে তালিকা প্রকাশিত হবে এবং তখনই বোঝা যাবে রাজ্যের প্রকৃত ভোটার সংখ্যা কত দাঁড়াল।

এই বিশাল সংখ্যক বাদ পড়া ও বিচারাধীন ভোটারের ভেতরে কারা রয়েছেন, সেটিই এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে এই অনিশ্চয়তা বেশি হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে, সংখ্যালঘু ভোটারদের ওপর এর প্রভাব কতটা।

মুর্শিদাবাদ জেলায় ১১ লক্ষেরও বেশি ভোটারের পরিচয় এখনো অনিশ্চিত। মালদায় এই সংখ্যা প্রায় ৮ লক্ষ ২৮ হাজার। উত্তর ২৪ পরগনায় প্রায় ৫ লক্ষ ৯১ হাজার এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় প্রায় ৫ লক্ষ ২২ হাজার ভোটার বিচারাধীন তালিকায় রয়েছেন। এই চারটি জেলায় মোট বিচারাধীন ভোটারের প্রায় অর্ধেকের বসবাস। এই অঞ্চলগুলোতেই সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম ভোটারের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।

ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এই প্রক্রিয়া কি সংখ্যালঘু ভোটারদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে? বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছে যে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর সেই অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।

হুমায়ুন কবীর এবং আসাদউদ্দিন ওয়েইসি। ছবি: সংগৃহীত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, এই পরিস্থিতিতে মুসলিম ভোটারদের অংশগ্রহণ কমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে নির্বাচনের ফলাফলে। কারণ পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ভোট এখন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে। এই ভোট একসময় বামপন্থীদের দিকে থাকলেও গত এক দশকে তা বড় অংশে তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে সরে গেছে।

এই বাস্তবতায় মুসলিম ভোটের যেকোনো পরিবর্তনই রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে এমন বহু বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে মুসলিম ভোটাররা সরাসরি ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে অন্তত ১২৫টি আসনে মুসলিম ভোটারের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে প্রায় ৭০টি আসনে মুসলিম ভোটাররা সরাসরি জয়-পরাজয় নির্ধারণ করতে পারেন। আরও ৩০ থেকে ৩৫টি আসনে এই ভোটাররা নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারেন।

অর্থাৎ মোট প্রায় ১০০টিরও বেশি আসনে মুসলিম ভোট গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ফলে এই ভোটব্যাংকে সামান্য পরিবর্তনও বড় রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস তাদের প্রার্থী তালিকায় মুসলিম প্রতিনিধিত্ব বাড়িয়েছে। এবার তারা ২৯১টি আসনের মধ্যে ৪৭ জন মুসলিম প্রার্থী দিয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে এই সংখ্যা ছিল ৩৫। অর্থাৎ এবার প্রায় ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

এতে স্পষ্ট যে, তৃণমূল কংগ্রেস মুসলিম ভোট ধরে রাখতে এবং আরও মজবুত করতে সচেষ্ট। কারণ এই ভোটই তাদের ক্ষমতায় থাকার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবিঃ সংগৃহীত

অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিজেপির প্রার্থী তালিকায় মুসলিম প্রতিনিধিত্ব কার্যত নেই বললেই চলে। ফলে তাদের কৌশল ভিন্ন। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটকে একত্রিত করার চেষ্টা করছে, যা রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন ধরনের মেরুকরণের ইঙ্গিত দেয়।

এদিকে নতুন করে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করছেন ভরতপুরের বিদায়ী বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। তিনি নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন করে মুসলিম ভোটকে আলাদা শক্তি হিসেবে সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। তার সঙ্গে জোট গড়েছে সর্বভারতীয় একটি মুসলিমভিত্তিক রাজনৈতিক দল।

এই জোটের লক্ষ্য পরিষ্কার—মুসলিম ভোটকে একত্রিত করা এবং আলাদা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তারা নির্বাচনের আগে অন্তত ২০টি যৌথ সভা করার পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রথম সভা হবে মুর্শিদাবাদে এবং শেষ সভা কলকাতায়।

হুমায়ুন কবীরের বক্তব্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯০টি আসন রয়েছে যেখানে মুসলিম ভোটাররা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তিনি চাইছেন এই আসনগুলোতে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে। তার হিসাব অনুযায়ী, এই আসনগুলোতে যদি মুসলিম ভোট একজোট হয়, তবে বিধানসভায় একটি শক্তিশালী ব্লক তৈরি করা সম্ভব।

এই কৌশল সফল হলে তা তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ এতদিন মুসলিম ভোট অনেকটাই একমুখী ছিল। এখন তা ভেঙে গেলে ভোটের ফলাফল অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোট। উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া, পূর্ব বর্ধমান এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক কেন্দ্রে এই সম্প্রদায়ের প্রভাব রয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ উঠেছে, যা তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষোভ ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হতে পারে। ফলে শুধু মুসলিম ভোট নয়, মতুয়া ভোটের পরিবর্তনও নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের এবারের বিধানসভা নির্বাচন একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক, অন্যদিকে সংখ্যালঘু ভোটের পুনর্বিন্যাস, তার সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল।

মুসলিম ভোট এই নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, বিচারাধীন ভোটারদের চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্তি কতটা হয়। দ্বিতীয়ত, মুসলিম ভোট কতটা একমুখী থাকে বা ভেঙে যায়। তৃতীয়ত, নতুন রাজনৈতিক জোট কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

যদি মুসলিম ভোট বড় অংশে বিভক্ত হয়, তবে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য তা বড় ধাক্কা হতে পারে। আর যদি এই ভোট একজোট থাকে, তবে তারা আবারও শক্ত অবস্থানে থাকতে পারে।

অন্যদিকে বিজেপি এই বিভাজনের সুযোগ নিতে চাইবে। তাদের লক্ষ্য থাকবে বিরোধী ভোটকে ভাগ করে নিজেদের পক্ষে সুবিধা তৈরি করা।

সবশেষে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনে মুসলিম ভোট শুধু একটি ভোটব্যাংক নয়, বরং পুরো নির্বাচনী অঙ্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এই ভোটের দিক পরিবর্তন মানেই রাজনৈতিক ফলাফলের বড় পরিবর্তন।

এখন চোখ থাকবে শেষ পর্যন্ত ভোটার তালিকার চূড়ান্ত রূপ, রাজনৈতিক জোটের শক্তি এবং মাঠপর্যায়ের প্রচারের ওপর। কারণ এই তিনটির সমন্বয়েই নির্ধারিত হবে, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার পাল্লা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে ঝুঁকবে।

এই শাখার আরও খবর

মহান স্বাধীনতা দিবস আজ, বীর সন্তানদের শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে জাতি

মেলবোর্ন, ২৬ মার্চ- আজ ২৬ মার্চ। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ৫৫তম বার্ষিকী। ১৯৭১ সালের এই দিনে বিশ্ব মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ ঘটে নতুন…

পানি থেকে তোলা হচ্ছে বাস, বের হচ্ছে লাশ

মেলবোর্ন, ২৬ মার্চ- রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়া বাসটির উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে। বুধবার (২৫ মার্চ) রাত সাড়ে ১১টার দিকে পানির নিচে থাকা বাসটির সামনের…

শহীদ মিনারে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ‘আলোর মিছিল’

মেলবোর্ন, ২৬ মার্চ- স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘আলোর মিছিল’ কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। বুধবার (২৫…

পুরোনো রাউটার নিয়ে যে সতর্কবার্তা দিল এফবিআই

মেলবোর্ন, ২৬ মার্চ- পুরোনো রাউটার ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন করে সতর্কবার্তা জারি করেছে মার্কিন সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)। সংস্থাটি জানিয়েছে, ‘এভিরিকন’ (AVrecon) নামের একটি বিপজ্জনক…

এবার জ্বালানি সংকটে ‘করোনার পরিস্থিতি’ হতে পারে এশিয়াজুড়ে

মেলবোর্ন, ২৬ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়াজুড়ে ‘করোনা-সদৃশ’ জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী সামরিক পদক্ষেপ এবং এর জেরে তেল সরবরাহে বিঘ্ন…

৭ বছর পর ইরান থেকে এলপিজি কিনল ভারত, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রভাব

মেলবোর্ন, ২৬ মার্চ- সাময়িকভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রেক্ষাপটে সাত বছর পর প্রথমবারের মতো ইরান থেকে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি করেছে ভারত। জ্বালানি বাণিজ্যের তথ্য…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au