দ্রুত ইরান যুদ্ধ শেষ করতে কর্মকর্তাদের সময়সীমা বেধে দিলেন ট্রাম্প
মেলবোর্ন, ২৭ মার্চ- ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত দ্রুত শেষ করতে চান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধের ইতি টানার লক্ষ্য নির্ধারণ করে তিনি…
মেলবোর্ন, ২৬ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন অবস্থান স্পষ্ট করেছে ইরান। দেশটি জানিয়েছে, বৈশ্বিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ পুরোপুরি বন্ধ নয়; বরং নির্দিষ্ট কিছু ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ও অনুমোদিত দেশের জাহাজের জন্য এটি সীমিতভাবে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এই তালিকায় বাংলাদেশের নামও রয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান।
ইরানের ঘোষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানের জাহাজগুলো প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে চলাচল করতে পারবে। তবে শত্রু বা সরাসরি সংঘাতে জড়িত দেশগুলোর জাহাজের ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। ধারণা করা হয়, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলএনজি এই সংকীর্ণ প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়। ফলে এই পথে যেকোনো ধরনের বাধা বা নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে।

হরমুজ প্রণালি। ছবি- সংগৃহীত
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই তেহরান এই প্রণালিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এতে করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, পশ্চিমা গণমাধ্যমে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। তিনি জানান, অনেক দেশের শিপিং কোম্পানি ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিরাপদ যাতায়াতের অনুরোধ জানিয়েছে। ইরান যেসব দেশকে ‘বন্ধু’ হিসেবে বিবেচনা করে বা বিশেষ কারণে অনুমতি দিয়েছে, তাদের জাহাজের নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী।
আরাগচি আরও বলেন, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে এই সুযোগ গ্রহণ করেছে এবং তাদের জাহাজ প্রণালি দিয়ে পারাপার করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, গত কয়েক রাতে ভারতের দুটি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করেছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশও এই তালিকায় রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ সুবিধা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, যারা এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িত বা শত্রুপক্ষ হিসেবে বিবেচিত, তাদের কোনো জাহাজকে এই প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের ঘনিষ্ঠ কিছু মিত্র দেশের জাহাজের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরো অঞ্চল কার্যত একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। তাই নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিবেচনায় শত্রুপক্ষের জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শর্ত সাপেক্ষে প্রণালি ব্যবহার চালু রাখা হয়েছে।
এদিকে চলতি সপ্তাহের শুরুতে পাকিস্তানগামী একটি কনটেইনার জাহাজকে হরমুজ প্রণালিতে আটকে দেওয়ার ঘটনা নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজা থেকে করাচিগামী ‘সেলেন’ নামের ওই জাহাজটির প্রয়োজনীয় ট্রানজিট অনুমতি না থাকায় ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর সেটিকে মাঝপথ থেকেই ফিরিয়ে দেয়।
বর্তমানে ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে প্রণালিতে নিজেদের শক্তিশালী উপস্থিতি বজায় রাখছে। সামরিকভাবে এই নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা হয়েছে, যাতে করে কোনো অননুমোদিত জাহাজ এই পথে চলাচল করতে না পারে।
আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থা লয়েডস লিস্টের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। কিন্তু চলতি মাসের ১ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত এই সংখ্যা প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে গেছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য বলছে, এই সময়ে মাত্র ১৫৫টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করেছে, যার মধ্যে ৯৯টি ছিল তেল ও গ্যাস পরিবাহী ট্যাংকার। এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট যে, প্রণালিতে চলাচল কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে।
বিশ্বজুড়ে এই পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে বিমান পরিবহন খাত থেকে শুরু করে সুপারমার্কেট পর্যন্ত প্রায় সব খাতেই ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় অনেক দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে এবং বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনেক দেশ ইতোমধ্যে জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণের কথা ভাবছে। করোনা মহামারির সময় যেভাবে সরকারগুলো অর্থনৈতিক সহায়তা ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল, তেমনি ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আলোচনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন দেশে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি আংশিক উন্মুক্ত রাখার ইরানের এই ঘোষণা একদিকে যেমন কিছু দেশের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিতও দিচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঘিরে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au