বাংলাদেশ

নোবেলজয়ী গ্রামীণ ব্যাংকের অ-নোবেলীয় কর্মকাণ্ড

উত্তরবঙ্গের সেচ প্রকল্পে ৩৮ বছরের অনিয়ম, গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

  • 6:48 pm - April 01, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৪৮ বার
গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১ এপ্রিল- উত্তরবঙ্গে কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮০–এর দশকে নেওয়া গভীর নলকূপ প্রকল্পকে ঘিরে দীর্ঘ ৩৮ বছরের অনিয়ম, চুক্তিভঙ্গ, আর্থিক বকেয়া ও প্রশাসনিক জটিলতার এক বিস্তৃত চিত্র সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের জন্য পরিচিত নোবেলজয়ী গ্রামীণ ব্যাংক এমন একটি সেচ প্রকল্পে যুক্ত হয়েছিল, যেখানে তাদের অভিজ্ঞতা বা সংশ্লিষ্টতা থাকার কথা ছিল না। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থতা, সরকারি অর্থের ক্ষতি এবং কৃষকদের ভোগান্তির ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

১৯৮৭ সালে বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলের কৃষি উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি উন্নয়ন তহবিলের যৌথ উদ্যোগে গভীর নলকূপ স্থাপনের একটি বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। সে সময়কার রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আগ্রহে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়, কারণ উত্তরবঙ্গ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে ছিল। প্রকল্পের আওতায় মোট ২০০০টি গভীর নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়।

এই প্রকল্পের খবর পেয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস উত্তরবঙ্গে ব্যাংকের কার্যক্রম বিস্তারের সুযোগ হিসেবে বিষয়টিকে দেখেন। যদিও গ্রামীণ ব্যাংক মূলত ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং সেচ কার্যক্রম পরিচালনায় তাদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, তবুও রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক সহযোগিতার মাধ্যমে তারা এই প্রকল্পে যুক্ত হয়। সেচ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তারা ‘গ্রামীণ কৃষি ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলে।

পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকের একটি চুক্তি হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী, ১৫০০টি গভীর নলকূপ প্রতিটি ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা দরে মোট ২৬ কোটি ২৫ লাখ টাকায় গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে শর্ত ছিল, প্রতিটি নলকূপের জন্য মাত্র ৬ হাজার ৫০০ টাকা করে ডাউনপেমেন্ট দিয়ে নলকূপ গ্রহণ শুরু করা যাবে। সেই হিসাবে গ্রামীণ ব্যাংক ১৫০০ নলকূপের বিপরীতে মাত্র ৯৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রাথমিকভাবে পরিশোধ করে।

চুক্তি অনুযায়ী পুরো নলকূপ গ্রহণ ও মূল্য পরিশোধ করার কথা থাকলেও ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের আগে গ্রামীণ ব্যাংক মাত্র ৫৭৩টি নলকূপ গ্রহণ করে এবং এরপর আর কোনো নলকূপ নেবে না বলে জানিয়ে দেয়। এতে প্রকল্পটি মাঝপথে থমকে যায় এবং উত্তরবঙ্গের সেচ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

চুক্তি অনুযায়ী গ্রহণ করা ৫৭৩টি নলকূপের জন্য মোট ৯ কোটি ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা পরিশোধের কথা থাকলেও গ্রামীণ ব্যাংক দীর্ঘ সময় ধরে এই অর্থ পরিশোধ করেনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের অডিট আপত্তি সৃষ্টি হয় এবং তা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা ও জনবল না থাকায় গ্রামীণ ব্যাংক নলকূপগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেনি। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক নলকূপ অচল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে সরকারের নির্দেশে এসব নলকূপের একটি বড় অংশ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

বকেয়া অর্থ আদায়ে ২০১১ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর মামলার রায় করপোরেশনের পক্ষে গেলেও গ্রামীণ ব্যাংক সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। ফলে বিষয়টি এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে এই জটিলতা নিরসনে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গ্রামীণ ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন এবং বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় জরিপ পরিচালিত হয়। এতে দেখা যায়, ৫৭৩টি নলকূপের মধ্যে বর্তমানে ১৭৯টি গ্রামীণ ব্যাংকের অধীনে, ৩৫৩টি বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষের অধীনে এবং ৪১টি কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের অধীনে রয়েছে।

পরবর্তীতে একটি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, গ্রামীণ ব্যাংক তাদের অধীনে থাকা ১৭৯টি নলকূপের মূল্য পরিশোধ করবে। ১৯৮৮ সালের নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী মোট ৩ কোটি ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা থেকে আগের ডাউনপেমেন্ট ৯৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা সমন্বয় করে প্রায় ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা পরিশোধের সুপারিশ করা হয়।

তবে সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, এই সিদ্ধান্ত সরকারের আর্থিক স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা করে না। কারণ, চুক্তি অনুযায়ী ১৫০০ নলকূপ গ্রহণ না করায় ডাউনপেমেন্ট বাতিল হওয়ার কথা ছিল এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও বিধান রয়েছে। পাশাপাশি ২২ বছর নলকূপ পরিচালনার মাধ্যমে অর্জিত আয় ও অবচয়ের হিসাবও বিবেচনায় আনা হয়নি।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি শুরু থেকেই পরিকল্পনা ও সক্ষমতার অভাবে দুর্বল ছিল। ফলে সরকারি বিনিয়োগের যথাযথ ব্যবহার হয়নি এবং কৃষকরাও প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

অন্যদিকে, গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি এবং বিষয়টি কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, বিষয়টি নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং নীতিনির্ধারণ, জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতার ঘাটতির একটি বড় উদাহরণ। তাদের মতে, একটি স্বতন্ত্র তদন্ত কমিটি গঠন করে পুরো বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়ানো যায়।

২০০৬ সালে দারিদ্র্য বিমোচনে অবদানের জন্য গ্রামীণ ব্যাংক ও এর প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। তবে উত্তরবঙ্গের এই সেচ প্রকল্প ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো সেই অর্জনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।

সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন

এই শাখার আরও খবর

আগামী রোববার থেকে হামের টিকা দেওয়া শুরু হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

মেলবোর্ন, ১ এপ্রিল- স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ঘোষণা করেছেন, আগামী রোববার (৫ এপ্রিল) থেকে দেশে হামের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।…

মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার নোটিস

মেলবোর্ন, ১ এপ্রিল- বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা মৃত্যুদণ্ড বাতিলের দাবিতে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (Bangladesh International Crimes Tribunal) আইনি নোটিস…

দক্ষিণ কোরিয়া ও ইন্দোনেশিয়া জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে চুক্তি স্বাক্ষর

মেলবোর্ন, ১ এপ্রিল-  দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং বুধবার ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো-র সঙ্গে সিউলের প্রেসিডেন্সিয়াল ব্লু হাউসে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত বৈশ্বিক…

যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি চাপে অস্ট্রেলিয়া, নাগরিকদের সংযমের আহ্বান আলবানিজের

মেলবোর্ন, ১ এপ্রিল- মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সামনে আসা সময়…

নেটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন ট্রাম্প

মেলবোর্ন, ১ এপ্রিল- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তিনি “গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন”, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে…

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনা মূল্যে স্কুল ড্রেস দেবে সরকার : প্রধানমন্ত্রী

মেলবোর্ন, ১ এপ্রিল- দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরেই প্রায় ২…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au