মিয়ানমারে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করলেন মিন অং হ্লাইং। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩ এপ্রিল- মিয়ানমারের সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং দেশটির পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। এর মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে তার রাজনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ আরও আনুষ্ঠানিক রূপ পেল।
৬৯ বছর বয়সী এই জেনারেল ২০২১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নেত্রী অং সান সু চির সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাকে আটক করেন। ওই ঘটনার পর সারা দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে ধীরে ধীরে সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নেয় এবং এখনো তা চলমান রয়েছে।
ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের পর তিনি সেনাবাহিনীপ্রধান থেকে বেসামরিক প্রেসিডেন্টে রূপান্তরিত হন। ওই নির্বাচনে সেনা-সমর্থিত একটি দল বিপুল ব্যবধানে জয় পায়। তবে পশ্চিমা দেশগুলো এই নির্বাচনকে ভাঁওতাবাজি বলে আখ্যা দিয়েছে এবং বলেছে, গণতন্ত্রের আবরণে সামরিক শাসন টিকিয়ে রাখার কৌশল এটি।
লাইভ সম্প্রচারে দেখানো ভোট গণনায় সহজেই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মিন অং হ্লাইং। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এই পদে আসার চেষ্টা করে আসছিলেন।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তিনি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদল করেন। ২০১১ সাল থেকে তিনি সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সোমবার পার্লামেন্টে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি নিজের উত্তরসূরি হিসেবে সাবেক গোয়েন্দা প্রধান ইয়ে উইন উ-কে সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেন, যাকে তার প্রতি অত্যন্ত অনুগত বলে মনে করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক নেতৃত্ব হস্তান্তর এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে মিন অং হ্লাইংয়ের উত্থান একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যার মাধ্যমে তিনি বেসামরিক সরকারের প্রধান হিসেবে নিজের ক্ষমতা আরও সুসংহত করতে চান এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে গত ছয় দশকের মধ্যে পাঁচ দশক সরাসরি দেশ পরিচালনা করা সেনাবাহিনীর স্বার্থও এতে সুরক্ষিত থাকবে।
স্বাধীন বিশ্লেষক অং কিয়াও সোয়ে বলেন, সেনাপ্রধানের পদ ছেড়ে প্রেসিডেন্ট হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার অনেকদিনের, আর এখন সেই লক্ষ্য বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
এদিকে, গত পাঁচ বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধ এখনো অব্যাহত রয়েছে। জান্তাবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী, যার মধ্যে সু চির দলের অবশিষ্টাংশ এবং দীর্ঘদিনের জাতিগত সংখ্যালঘু সশস্ত্র সংগঠনগুলো রয়েছে, তারা এই সপ্তাহে একটি যৌথ জোট গঠন করেছে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর জন্য।
‘ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন গঠনের স্টিয়ারিং কাউন্সিল’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য হচ্ছে সব ধরনের স্বৈরশাসন, বিশেষ করে সামরিক শাসন সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা এবং নতুন রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পরিস্থিতিতে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো একদিকে সামরিক চাপের মুখে পড়তে পারে, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর পক্ষ থেকেও তাদের ওপর নজরদারি বাড়তে পারে, কারণ এসব দেশ মিন অং হ্লাইংয়ের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী হতে পারে।
বিশ্লেষক সাই কিই জিন সোয়ে বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সংগঠনগত স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এই সংকট বাড়তে থাকলে পারস্পরিক আস্থা তৈরি, দৃঢ় সমঝোতায় পৌঁছানো এবং সমন্বিতভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ