ইরান যুদ্ধের কারণে এখনও অচলবস্থা হরমুজ প্রাণালিতে, ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৮ এপ্রিল- ইরান যুদ্ধ ও লেবাননে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন করে স্বস্তি ও অনিশ্চয়তা একসঙ্গে তৈরি হয়েছে। ইরান একে “সম্পূর্ণ উন্মুক্ত” ঘোষণা করলেও বাস্তবে জাহাজ চলাচল ধীর গতিতে চলছে, শিপিং খাতে সতর্কতা বজায় রয়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এখনো অস্থির। তেলের দাম কমে গেলেও কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও নিরাপত্তা উদ্বেগ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক শিপিং ডেটা ও বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে এখনো সেখানে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়নি এবং গতি অনেক ধীর।
শুক্রবার (স্থানীয় সময়) ইরানের পক্ষ থেকে ঘোষণা দিয়ে বলা হয়, লেবাননে চলমান যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, যুদ্ধবিরতির বাকি সময়ের জন্য সমন্বিত রুটে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল “সম্পূর্ণ উন্মুক্ত” থাকবে। তবে এই যুদ্ধবিরতি কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা।
এই ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বড় ধরনের পতন হয়। একদিনেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০ শতাংশের বেশি কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ বাধা কমে যাওয়ার প্রত্যাশায় বিনিয়োগকারীরা দ্রুত বাজারে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন।
তবে বাস্তব চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। শিপিং ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের আশপাশে জাহাজ চলাচল খুব ধীর। বড় শিপিং কোম্পানিগুলো এখনো নিশ্চিত নয় পরিস্থিতি কতটা নিরাপদ। জার্মান শিপিং কোম্পানি হাপাগ-লয়েডের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ে এখনো কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিষ্কার হতে পারে।
মারিটাইম নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা আরও সতর্ক করেছেন। একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক কোরম্যাক ম্যাকগ্যারি বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে এই রুট দিয়ে শিপিং কার্যক্রম নিয়ে পরিস্থিতি “খুবই অনিশ্চিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ”।

দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে কার্যত অবরুদ্ধ রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি , ছবি: সংগৃহীত
অন্যদিকে, প্রথমবারের মতো একটি ক্রুজ জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। গ্রিসভিত্তিক জাহাজ “সেলেস্টিয়াল ডিসকভারি” প্রায় ৪৭ দিন দুবাইয়ে আটকে থাকার পর ওমানের মাসকাটের দিকে রওনা দিয়েছে। তবে জাহাজটিতে কোনো যাত্রী ছিল না।
আন্তর্জাতিক ডেটা অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরে প্রায় ৭০০ জাহাজ আটকে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৫০টি তেলবাহী ট্যাংকার, যেগুলো প্রায় ১৬ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য পণ্য বহন করছে।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরানের বন্দরে অবরোধ শুরুর পর থেকে ২০টির বেশি জাহাজ ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ২১টি জাহাজ মার্কিন নির্দেশে পথ পরিবর্তন করেছে।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি অবরোধ চালিয়ে যায় তবে হরমুজ প্রণালি আবারও বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি চলতে থাকলে এই প্রণালি “খোলা থাকবে না” এবং চলাচল কেবল ইরানের অনুমতিতে নির্ধারিত পথে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিস্থিতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে সমঝোতা হলে তিনি সেখানে যেতে পারেন। তিনি দাবি করেন, এটি “একটি ঐতিহাসিক দিন” এবং ইরান ভবিষ্যতে আর কখনো প্রণালি বন্ধ করবে না বলে সম্মতি দিয়েছে।
তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প ন্যাটোকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সংকটের সময় ন্যাটো কার্যকর ভূমিকা রাখেনি এবং এখন সাহায্যের প্রস্তাব দিলেও তা আর প্রয়োজন নেই।

ইরানের কেশম দ্বীপের কাছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাছ ধরার নৌকা ও পণ্যবাহী কনটেইনার জাহাজ চলাচল করছে,
ছবিঃ সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ঘোষণা দিয়েছে, তারা একটি বহুজাতিক “প্রতিরক্ষামূলক” মিশন গঠন করছে, যা হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সুরক্ষিত করবে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অনুকূলে এলে দ্রুত এই মিশন মোতায়েন করা হবে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব সরাসরি বিমান চলাচলেও পড়েছে। এয়ার কানাডা জানিয়েছে, জেট ফুয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা টরন্টো ও মন্ট্রিয়ল থেকে নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরের ফ্লাইট পাঁচ মাসের জন্য স্থগিত করছে।
অন্যদিকে বৈশ্বিক রাজনীতিতেও এই সংকট নতুন বিভাজন তৈরি করছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে হরমুজ প্রণালিতে নতুন কোনো সহায়তা চাওয়া হয়নি, তবে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা চলছে।
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে যে স্বস্তির বার্তা দেওয়া হচ্ছে, বাস্তবে তা এখনো অনিশ্চিত। জাহাজ চলাচল ধীর, শিপিং কোম্পানিগুলো সতর্ক অবস্থানে এবং বৈশ্বিক বাজার এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি।
সূত্রঃ নিউজ.এইউ