সোমবার থেকে দেশজুড়ে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু
মেলবোর্ন,২০ এপ্রিল- দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সোমবার (২০ এপ্রিল) থেকে সারা দেশে শুরু হচ্ছে হাম-রুবেলার ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি। স্বাস্থ্য বিভাগ…
মেলবোর্ন, ১৯ এপ্রিল: বাংলা বছরের শেষ দিন, চৈত্র সংক্রান্তিতে গ্রামবাংলার আকাশ-বাতাস জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক বিশেষ আবহ—চড়ক পূজা। এই পূজা শিবের আরাধনা, গাজন উৎসবের আবেগ, এবং বাঙালির প্রাচীন লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। পুরোনো বছরের দুঃখ-কষ্ট বিদায় দিয়ে নতুন বছরকে আহ্বান করার প্রত্যাশায় এই উৎসব ঘিরে গড়ে ওঠে এক অনন্য মিলনমেলা।
চড়ক পূজার সবচেয়ে আলোচিত ও বিস্ময়কর দিক হলো ভক্তদের আত্মনিবেদন ও দুঃসাহসিক আচার। বিশেষভাবে, ভক্তের পিঠে লোহার হুক বা বড়শি বিঁধিয়ে তাকে চড়ক গাছে ঝুলিয়ে ঘোরানো হয়—যা ‘বড়শি সন্ন্যাস’ নামে পরিচিত। ঘূর্ণন শেষে আশ্চর্যজনকভাবে ক্ষতচিহ্ন দ্রুত মিলিয়ে যায় বলে বিশ্বাস করা হয়। এই দৃশ্য যেমন ভীতিকর, তেমনি ভক্তির গভীরতাও প্রকাশ করে।
এই পূজাকে ঘিরে প্রস্তুতি চলে টানা পনের দিন, আর অনেক ক্ষেত্রে সন্ন্যাসীরা এক মাস পর্যন্ত কঠোর ব্রত, উপবাস ও সংযম পালন করেন। আয়োজকরা শিব-পার্বতীর পালা গেয়ে পাড়া-পাড়া ঘুরে চাল-ডাল, অর্থ ও ভিক্ষা সংগ্রহ করে পূজার ব্যয় নির্বাহ করেন। ফলে উৎসবটি হয়ে ওঠে সামষ্টিক অংশগ্রহণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

চড়ক পূজার প্রাচীন আচার ও ধর্মীয় বিশ্বাসে মিশে থাকা গ্রামবাংলার সংস্কৃতি। ছবি: Facebook
চড়ক পূজার আগের দিন পালিত হয় ‘নীল পূজা’। এই উৎসবের আগে একদল শিল্পী ঢোল-কাঁসর, ঘুঙুরের তালে তালে গ্রামজুড়ে ঘুরে গাজনের গান গেয়ে পরিবেশনা করে। এই দলকে অনেক স্থানে ‘নীল পাগলের দল’ বলা হয়।

কোন কোন অঞ্চলে শিব ও সখী সেজে একদল শিল্পী ঢোল-কাঁসর, ঘুঙুরের তালে তালে গ্রামজুড়ে ঘুরে গাজনের গান গেয়ে পরিবেশনা করে। এই দলকে অনেক স্থানে ‘নীল পাগলের দল’ বলা হয়। ছবি: Facebook
চড়কের দিন ভক্তরা ফুল-ফল ও বাদ্যযন্ত্রসহ শিবপ্রণাম করেন এবং নানা কঠোর আচার পালন করেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘বঁটি-ঝাঁপ’, ‘কাঁটা-ঝাপ’, ‘ঝুল-ঝাঁপ’, ‘বাণ-সন্ন্যাস’ (জিভে লৌহশলাকা বিদ্ধ রাখা), এবং ‘বেত্র-সন্ন্যাস’। এছাড়া আগুনের ওপর হাঁটা, অঙ্গারের ওপর নৃত্য, এমনকি শরীরের বিভিন্ন অংশে শলাকা বিদ্ধ করার মতো আচারও পালন করা হয়, যা ভক্তির চরম প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এসব আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অশুভ শক্তি দূর হয় এবং জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি আসে। অনেকের মতে, এই রীতির শিকড় প্রাচীন কৌমসমাজের আত্মত্যাগমূলক প্রথার সঙ্গে যুক্ত। যদিও ১৮৬৩ সালে ব্রিটিশ সরকার আইন করে কিছু কষ্টকর আচার নিষিদ্ধ করে, তবুও গ্রামবাংলার অনেক স্থানে এখনো এসব ঐতিহ্য কোনো না কোনোভাবে টিকে আছে। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সিঙ্গিয়া গ্রামে চৈত্র সংক্রান্তি ও চড়ক পূজা তেমনি একটি শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী পূজা।
চড়ক পূজা মূলত অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের একটি বড় ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পরিচিত হলেও, এর আবেদন ধর্ম-বর্ণের সীমানা ছাড়িয়ে সর্বজনীন হয়ে উঠেছে। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর—সবাই এই উৎসব উপভোগ করতে একত্রিত হয়। শিব-পার্বতীর পালা, গাজনের গান, লোকনৃত্য এবং মেলার আমেজ মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে আবহমান বাংলার এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক উৎসব।
ইতিহাসের দিক থেকে দেখা যায়, প্রাচীন পুরাণে শিবের আরাধনার উল্লেখ থাকলেও চড়ক পূজার সরাসরি বর্ণনা নেই। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৫শ শতকে সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামে এক রাজা এই পূজার প্রচলন করেন। আবার বাণরাজা ও শিবভক্তির নানা কিংবদন্তিও এ উৎসবকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au