লোকবিশ্বাস ও ঐক্যের বন্ধনে গড়ে ওঠা গোমিরা—ঠাকুরগাঁওয়ের অনন্য সাংস্কৃতিক পরিচয়। ছবি: হৈমন্তী শুক্লা
মেলবোর্ন, ১৯ এপ্রিল: ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সিঙ্গিয়া গ্রামে চৈত্র সংক্রান্তি ও চড়ক পূজা উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হলো শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মুখোশ নৃত্য ‘গোমিরা’। শিবকালী মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই লোকজ সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন স্থানীয় গ্রামবাসী, ভক্ত ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং আগত বছরের শান্তি, সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনায় এই প্রাচীন ঐতিহ্য আজও এই অঞ্চলের মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
গোমিরা নৃত্য, আঞ্চলিকভাবে ‘মুখা খেল’ নামে পরিচিত, মূলত উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর অঞ্চলের একটি প্রাচীন লোকসংস্কৃতি। মুখোশ পরিহিত এই নৃত্যের মাধ্যমে দেব-দেবীর আরাধনা করে অশুভ শক্তিকে দূর করে শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার জন্য প্রার্থনা করা হয়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই নৃত্য দেবতার সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম, যার মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও ফসলি জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি আসে।
এই নৃত্যের নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে। কারও মতে, স্থানীয় দেবী ‘গ্রাম চণ্ডী’ থেকে ‘গোমিরা’ নামের উৎপত্তি, আবার অনেকে মনে করেন গামার গাছের নাম থেকেই এর নামকরণ, কারণ ঐ গাছের কাঠ দিয়েই মুখোশ তৈরি করা হয়। তবে এর সূচনার কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক দলিল নেই; লোককথা ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে আসা বিশ্বাসই এর ইতিহাসকে জীবন্ত রেখেছে।
গোমিরা নৃত্যের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো মুখোশ। গামার কাঠ, রং ও প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে এই মুখোশ তৈরি করা হয়, যা স্থানীয় কারিগরদের হাতে গড়ে ওঠে। অনেক সময় মানত পূরণের অংশ হিসেবে ভক্তরা এই মুখোশ উৎসর্গ করেন। বিশ্বাস করা হয়, এই মুখোশের মাধ্যমেই দেবতাদের রূপ প্রতিফলিত হয় এবং অশুভ শক্তির প্রভাব দূর হয়।
এই নৃত্যে মূলত আদি শক্তির আরাধনা করা হয় এবং শিবসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর আহ্বান জানানো হয়। বৈশাখ থেকে আষাঢ় মাস পর্যন্ত, ফসল তোলার মৌসুমে কিংবা আম উৎসবের সময় এই নৃত্য বেশি দেখা যায়। শ্মশান কালী ও আমাত কালী পূজার সময়ও এর আয়োজন হয়ে থাকে। তবে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই; বিভিন্ন গ্রামে বিভিন্ন সময়ে এই নৃত্য পরিবেশিত হয়।
গোমিরা নৃত্য সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত—পুরোনো ধারার গোমিরা নৃত্য এবং রাম বনবাস কাহিনিভিত্তিক পরিবেশনা। পুরোনো ধারায় বুড়ো-বুড়ি, শ্মশান কালী, ডাকিনী, বাঘ ও নৃসিংহ অবতারের মতো পৌরাণিক চরিত্র ফুটে ওঠে। অন্যদিকে রাম বনবাস অংশে রামের বনবাসের কাহিনি ঢাকের তালে নৃত্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। এখানে কোনো লিখিত গান বা কবিতা নেই; শরীরী ভঙ্গি ও বাদ্যযন্ত্রের তালের মধ্য দিয়েই গল্প জীবন্ত হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই নৃত্যের সময় কখনো কখনো শিল্পীদের মধ্যে দেবতুল্য ‘ভর’ আসে। তখন গোমিরা ঘটের পবিত্র জল ছিটিয়ে তাদের শান্ত করা হয় বলে প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে।
এই নৃত্য সাধারণত গ্রামের পুরুষরাই পরিবেশন করেন। তারা দৈনন্দিন জীবনে কৃষিকাজ বা অন্যান্য পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও উৎসবের সময় মুখোশ পরে নারী, পশু ও পৌরাণিক চরিত্রের রূপ ধারণ করেন। এর মধ্য দিয়েই তারা প্রাচীন ঐতিহ্যকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন।

শতাব্দীপ্রাচীন এই লোকঐতিহ্য আজও ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের জীবন্ত সংস্কৃতির অংশ। ছবি: হৈমন্তী শুক্লা
গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, একসময় ঈশ্বর মানব রূপে পৃথিবীতে এসে মানুষকে আশীর্বাদ করেছিলেন এবং অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। সেই বিশ্বাস থেকেই গোমিরা নৃত্য যুগ যুগ ধরে এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
মুখোশের আড়ালে যেমন লুকিয়ে থাকে অদৃশ্য শক্তিকে সন্তুষ্ট করার আধ্যাত্মিক প্রচেষ্টা, তেমনি এতে মিশে আছে সামাজিক ঐক্য, আত্মরক্ষা ও লোকবিশ্বাসের ইতিহাস। শ্রমজীবী মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এই লোকনৃত্য আজও বাংলার দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে টিকে আছে।
কারো কারো মতে এই আয়োজনগুলো মূলত গ্রামদেবতা বা স্থানীয় দেব-দেবীকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যেই করা হয়। অতীতে মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নানান বিপদ-আপদ থেকে রক্ষার বিশ্বাসও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। সেই সঙ্গে সমাজে শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা ও অশুভ শক্তির বিনাশের প্রার্থনাও এতে অন্তর্ভুক্ত।
ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের গোমিরা নৃত্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর দলীয় কাঠামো। নৃত্যশিল্পীদের মধ্যে একজন দলনেতা থাকেন। সবাই নাচতে নাচতে একসময় মাঠ ত্যাগ করলেও দলনেতা একাই থেকে যান এবং নৃত্য চালিয়ে যান। এরপর ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যে ‘ভর’ আসার বিশ্বাস রয়েছে। তখন তাকে শান্ত করার জন্য পূজা ও আচার-অনুষ্ঠান করা হয়। প্রতীকী অর্থে, এটি গ্রামদেবতা বা অশরীরী শক্তিকে সন্তুষ্ট করার একটি রূপ হিসেবে দেখা হয়।
গোমিরা নৃত্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নৃত্যশিল্পীরা নেচে নেচে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পূজার নিমন্ত্রণ পৌঁছে দেন। এটি শুধু একটি পরিবেশনা নয়, বরং সমগ্র গ্রামের মানুষকে একত্রিত করার একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, গোমিরা নৃত্য কেবল একটি লোকজ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা নয়, এটি গ্রামীণ সমাজের বিশ্বাস, ঐক্য এবং আধ্যাত্মিকতার এক গভীর প্রতিচ্ছবি। নৃত্যশিল্পীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পূজার নিমন্ত্রণ পৌঁছে দেওয়া যেমন মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধনকে দৃঢ় করে, তেমনি সমগ্র গ্রামকে এক অভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিসরে যুক্ত করে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা এই ঐতিহ্য আজও ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে, যা গোমিরা নৃত্যকে একটি জীবন্ত লোকঐতিহ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
হৈমন্তী শুক্লা
দিনাজপুর, বাংলাদেশ