নতুন দল গঠন করলেন বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২০ এপ্রিল- সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ১৯ এপ্রিল ‘বাংলাদেশ আজাদ পার্টি’ নামে তার নেতৃত্বাধীন নতুন দলের আত্মপ্রকাশের পর থেকেই তার উদ্দেশ্য, পটভূমি এবং অতীত কর্মকাণ্ড ঘিরে নানা বিতর্ক সামনে আসছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে মূলধারার রাজনীতিতে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করলেও বড় কোনো দল তাকে গ্রহণ না করায় শেষ পর্যন্ত নিজস্ব রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ার পথ বেছে নিয়েছেন হাসিনুর রহমান। বিএনপি, এনসিপি এবং জামায়াতে ইসলামী—কোনো দলই তাকে সরাসরি দলে নিতে আগ্রহ দেখায়নি। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের আগে জামায়াত থেকে মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা এবং বিভিন্ন মহলের তদবিরও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। এই প্রেক্ষাপটে নতুন দল গঠনকে অনেকে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের কৌশল হিসেবেই দেখছেন।
তবে নতুন দল গঠনের পেছনে তার অতীত কর্মকাণ্ডই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন গোপন নথি ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হাসিনুর রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আছে, ২০০৪ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তিনি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (ইউএলএফএ) এবং এনএসসিএন (আই-এম)-এর মতো গোষ্ঠীকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ ও হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগও উঠে এসেছে।

বরখাস্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান-কে ঘিরে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে।ছবিঃ সংগৃহীত
সামরিক আদালতের নথি অনুযায়ী, বিদেশি সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের দায়ে তাকে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে চাকরিচ্যুত করা হয় এবং চার বছর তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তার সহযোগী আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকেও একই ধরনের অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে তার আগাম মুক্তির বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে সরকারবিরোধী আন্দোলন ঘিরেও তার নাম নতুন করে আলোচনায় আসে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ওই সময় ব্যবহৃত ৭.৬২ ক্যালিবারের প্রাণঘাতী গুলির উৎস এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে কিছু সাবেক সেনা কর্মকর্তার সম্ভাব্য সংযোগ থাকতে পারে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে আসে হাসিনুর রহমানের নাম। এমনকি তিনি নিজেই বিভিন্ন সময়ে ওই আন্দোলনে ‘সশস্ত্র উপস্থিতি’ থাকার দাবি করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিতর্কিত ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি আদালত কক্ষে। সেখানে এক নারী আইনজীবীকে হুমকি ও অশালীন আচরণের অভিযোগ ওঠে হাসিনুর রহমানের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি নিয়ে আদালতের ভেতরে তৎক্ষণাৎ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া এবং তা গণমাধ্যমে না আসা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
গোয়েন্দা নথিতে আরও দাবি করা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু অবসরপ্রাপ্ত ও বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিকল্পনায়ও যুক্ত ছিলেন তিনি। একই সঙ্গে বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ও ভাড়াটে সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। যদিও এসব তথ্যের সবগুলোই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই বা নিশ্চিত করা হয়নি।
এ অবস্থায় নতুন রাজনৈতিক দল গঠনকে অনেকেই শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং বিতর্কিত অতীত থেকে বেরিয়ে এসে একটি নতুন পরিচয় তৈরি করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে ‘ভারতীয় প্রভাবমুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ার স্লোগান এবং ১৭ দফা কর্মসূচি ঘোষণার মাধ্যমে দলটি একটি শক্ত অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই স্লোগান বাস্তব রাজনীতিতে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
নতুন দলের আত্মপ্রকাশের পেছনে জামায়াতে ইসলামী ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও সামনে এসেছে। যদিও দলটি সরাসরি তাকে অন্তর্ভুক্ত না করলেও একটি ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে সহায়তা করেছে বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার কথাও শোনা যাচ্ছে, যদিও এসব বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ
আরও পড়ুন-