তারেক-জাইমার যে কুৎসিত ছবি নিয়ে ছাত্রদল-শিবির মুখোমুখি
মেলবোর্ন, ২৪ এপ্রিল- ফেসবুকে এআই দিয়ে তৈরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমানের একটি আপত্তিকর ছবি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।…
মেলবোর্ন, ২৪ এপ্রিল- দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি শব্দ ‘গুপ্ত’। আপাতদৃষ্টিতে একটি সাধারণ শব্দ হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এটি ঘিরে যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কেবল শিক্ষাঙ্গনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা রাজপথ পেরিয়ে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। মূলত ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে এই ‘গুপ্ত’ বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
গত কয়েকদিনে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে যে ধরনের সহিংসতা, পাল্টাপাল্টি হামলা, গ্রাফিতি যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক বাকবিতণ্ডা দেখা গেছে, তা শুধু শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা নয়, সামগ্রিকভাবে ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। কোথাও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা, কোথাও ককটেল বিস্ফোরণ, আবার কোথাও প্রতিপক্ষের ওপর নির্মম শারীরিক আঘাত এসব ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেয়ালজুড়ে এখন ‘গুপ্ত’ শব্দের গ্রাফিতি চোখে পড়ছে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল শিবিরকে ‘গুপ্ত’ আখ্যা দিয়ে দেয়াল লিখন করছে, অন্যদিকে শিবির ছাত্রদলকে ‘রামদা দল’ বলে পাল্টা প্রচারণা চালাচ্ছে। এই গ্রাফিতি যুদ্ধই অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। রাজধানীর শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল এলাকা, পাবনার ঈশ্বরদী, চট্টগ্রামসহ দেশের নানা স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হল এবং ডাকসু ভবনের দেয়ালে ‘গুপ্ত’ শব্দ লিখতে গিয়ে দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। পরদিন রাতেই শাহবাগ মোড়ে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে উভয়পক্ষ। একই দিনে পাবনার ঈশ্বরদীতেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেয়ালজুড়ে এখন ‘গুপ্ত’ শব্দের গ্রাফিতি চোখে পড়ছে। ছবিঃ সংগৃহীত
এই উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে পরস্পরের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ। ছাত্রদলের দাবি, ছাত্রশিবির দীর্ঘদিন ধরে অন্য সংগঠনের ভেতরে ‘গুপ্তভাবে’ প্রবেশ করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে এবং বিগত সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনে অংশ নিয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকেই হঠাৎ করে নিজেদের পরিচয় বদলে নতুন অবস্থানে এসেছে।
অন্যদিকে ছাত্রশিবির এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত অপপ্রচার। তারা বরাবরই নিজেদের অবস্থানে সক্রিয় ছিল, তবে অতীত রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রকাশ্যে কাজ করার সুযোগ সীমিত ছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থেকে তারা কাজ করেছে এবং সাম্প্রতিক ছাত্রসংগঠন নির্বাচনে তার প্রতিফলন ঘটেছে বলেও দাবি তাদের।
এই পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অভিযোগ-প্রতিআরোপ পরিস্থিতিকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে একটি শব্দই সংঘর্ষের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল শব্দের লড়াই নয়; বরং এর ভেতরে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, আধিপত্যের লড়াই এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্ন।
চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক সংঘর্ষকে এই উত্তেজনার সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেখানে দেয়ালে লেখা ‘ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ’ বাক্য থেকে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে ‘গুপ্ত’ লেখা হলে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ২০ জন আহত হন। গুরুতর আহতদের মধ্যে একজনের পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।
এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা দ্রুত দেশজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। এরপর থেকে রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর, কুমিল্লা, সিলেট, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ, মিছিল ও পাল্টা কর্মসূচি শুরু হয়।
সংঘর্ষে কারা জড়িত ছিল, তা নিয়েও নানা তথ্য সামনে এসেছে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এতে ছাত্র সংগঠনের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও যুক্ত ছিলেন। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, বিষয়টি শুধুমাত্র ছাত্ররাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর প্রভাব বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরেও বিস্তৃত।
পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, এর প্রভাব জাতীয় সংসদেও পড়ে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনার সময় সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এ নিয়ে তীব্র বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। সরকারপক্ষের বক্তব্যে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা হয়, অন্যদিকে বিরোধীপক্ষ সংসদে ব্যবহৃত ভাষা ও আচরণের প্রতিবাদ জানায়।
এই বিতর্কের মধ্যে ছাত্রনেতারাও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। কেউ শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন, কেউ প্রতিপক্ষকে অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী করেছেন। তবে বাস্তবে মাঠের পরিস্থিতি বলছে, উত্তেজনা কমার বদলে আরও বাড়ছে।

শাহবাগে ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিকের ওপর হামলা। ছবিঃ সংগৃহীত
গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকার শাহবাগ থানার সামনে সংঘটিত একটি হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সেখানে ডাকসুর দুই নেতা এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিকের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। উভয়পক্ষই একে অপরকে দায়ী করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্ট, ভুয়া তথ্য প্রচার এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ার জেরে এই ঘটনা ঘটেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘গুপ্ত’ শব্দটির রাজনৈতিক অর্থ কীভাবে তৈরি হলো, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকেই এই শব্দটি নতুন করে আলোচনায় আসে। বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে বলা হয়, কিছু শিবিরের নেতা পূর্বের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রেখে আওয়ামি লীগের ছাত্র সংগঠনে যুক্ত ছিলেন। সেখান থেকেই ‘গুপ্ত রাজনীতি’ শব্দবন্ধটির প্রচলন ঘটে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পুরো পরিস্থিতি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির একটি নতুন মোড় নির্দেশ করছে। অতীতে ছাত্ররাজনীতি যেখানে আদর্শ ও মতাদর্শভিত্তিক ছিল, এখন তা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব বিস্তার এবং সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের দিকে ঝুঁকছে। একই সঙ্গে এটি বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ ছাত্রসংগঠনগুলো প্রায়ই তাদের মূল দলের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
অনেকেই মনে করছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ‘গুপ্ত’ বিতর্ক আরও বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। কারণ এটি কেবল একটি শব্দের লড়াই নয়; বরং এর ভেতরে রয়েছে ক্ষমতার লড়াই, পরিচয়ের প্রশ্ন এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনা।
এই বাস্তবতায় শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক চর্চার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে। অন্যথায়, একটি শব্দকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই উত্তেজনা দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au