মেলবোর্ন, ৮ জুন- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনলাইন প্রতারণা ও মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ক্যাম্বোডিয়ার ওপর আরও চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির এক নতুন প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রতারণা কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে ক্যাম্বোডিয়ার সাম্প্রতিক অভিযান ‘পদ্ধতিগত ব্যর্থতায়’ ভুগছে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতারণা চক্রের কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যাম্বোডিয়া সরকার কিছু অভিযানে সাফল্য পেলেও তা বিচ্ছিন্ন ও সীমিত। বহু প্রতারণা কেন্দ্র চালু রয়েছে এবং মানবপাচারের শিকার হয়ে সেখানে কাজ করতে বাধ্য হওয়া ব্যক্তিদের যথাযথ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে না।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ক্যাম্বোডিয়ার কর্তৃপক্ষ অন্তত ১৬টি নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দিয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে পরিচিত প্রতারণা চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, এসব প্রতারণা কেন্দ্র আন্তর্জাতিক অপরাধী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক ও সংকটবিষয়ক প্রধান অ্যান্ড্রু উইথারফোর্ড বলেছেন, ক্যাম্বোডিয়ার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা সহযোগিতার সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে প্রতারণা কেন্দ্রগুলো বন্ধ এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
তিনি বলেন, ক্যাম্বোডিয়ার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক নজরদারি, সমন্বয় ও সহায়তা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে আসিয়ানসহ আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে একটি সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
উইথারফোর্ড আরও বলেন, শুধু প্রতারণা চক্র দমন নয়, মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধারে আশ্রয়কেন্দ্র ও নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও অস্ট্রেলিয়ার সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি আধুনিক দাসত্ব ও মানবপাচার মোকাবিলায় অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব আইন ও প্রয়োগ ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা উচিত।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ক্যাম্বোডিয়াসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। অনলাইন প্রতারণা চক্র শনাক্ত ও ভেঙে দেওয়া, প্রতারণার শিকারদের সুরক্ষা এবং মানবপাচার প্রতিরোধে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া এরই মধ্যে আসিয়ান, ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্র মোকাবিলায় সহযোগিতা আরও গভীর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশটির ফেডারেল পুলিশও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপভিত্তিক সাইবার অপরাধী ও মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ফায়ারস্টর্ম’ নামে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের মার্চে ক্যাম্বোডিয়া সরকার এপ্রিলের মধ্যে দেশের সব প্রতারণা কেন্দ্র বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল। সরকার দাবি করেছিল, ২৫০টি সন্দেহভাজন স্থানের মধ্যে প্রায় ২০০টি বা ৮০ শতাংশ বন্ধ করা হয়েছে। তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিহ্নিত ৮৬টি প্রতারণা কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ২৪টিতে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কয়েকটি স্থানে পুলিশি অভিযানের আগেই গণপালানো বা পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
প্রতিবেদনটিতে ক্যাম্বোডিয়া সরকারকে মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রতারণা চক্রবিরোধী অভিযানের কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়ন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন প্রতারণা ও মানবপাচার এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় আন্তঃসীমান্ত অপরাধে পরিণত হয়েছে। ফলে এ সমস্যা মোকাবিলায় একক কোনো দেশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ ও কঠোর আইন প্রয়োগ।