পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৪ এপ্রিল- ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট শেষ হওয়ার পর রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ। ১৫২টি আসনে রেকর্ড ভোটদানের পর এখন দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল তৃণমূল কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা পার্টি পরস্পরবিরোধী দাবি করছে দু’পক্ষই নিজেদের জয় নিশ্চিত বলে মনে করছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, প্রথম দফার ভোটেই তারা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার “কাছাকাছি” পৌঁছে গেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই দফার ফলাফল বিজেপির জন্য বড় ধাক্কা এবং দলটির রাজনৈতিক ভিত্তি “ভেঙে পড়ার পথে”। অন্যদিকে বিজেপি বলছে, রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা “গুণ্ডামি ও ভয়ভীতির রাজনীতি” এবার শেষ হবে এবং ভোটের ফলাফলেই বাংলার মানুষের প্রকৃত ইচ্ছা প্রতিফলিত হবে।
প্রথম দফার ভোটে রাজ্যের মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে ১৫২ আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় দফা অনুষ্ঠিত হবে ২৯ এপ্রিল, যেখানে বাকি ১৪২ আসনে ভোট হবে। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে ৪ মে। সরকার গঠনের জন্য যেকোনো দলকে অন্তত ১৪৮ আসন পেতে হবে।
ভোট শেষ হওয়ার পরপরই রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বেড়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গের দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে তৃণমূলের একাধিক নেতার বরাতে বলা হয়, দলটি দাবি করছে তারা ইতোমধ্যেই ১২৫টির বেশি আসনে জয়ী হতে যাচ্ছে, যা দ্বিতীয় দফার ভোটের পর ১৩৫ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দ্বিতীয় দফায় দক্ষিণবঙ্গের যেসব আসনে ভোট হবে, সেগুলো তাদের “ঘাঁটি” হিসেবে পরিচিত। সেই কারণে চূড়ান্ত ফলাফলে বিজেপি বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়বে।
তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ এবং রাজ্যের মন্ত্রী ব্রাত্য বসু একই সুরে দাবি করেন, প্রথম দফার ভোটে জনগণের বড় অংশ তৃণমূলের পক্ষেই রায় দিয়েছে। তাদের মতে, ভোটের হার বেড়ে যাওয়া এবং বিপুল সংখ্যক নারীর ভোটদান তাদের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত। কুণাল ঘোষ বলেন, তারা আগে থেকেই অনুমান করেছিলেন যে ভোটার উপস্থিতি রেকর্ড হবে। তার ভাষায়, ভোটার তালিকা সংশোধনের কারণে কিছু নাম বাদ পড়লেও বৈধ ভোটাররা “চক্রান্তের বিরুদ্ধে” ভোট দিয়েছেন।
অন্যদিকে, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। দলটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে কলকাতায় দলীয় কার্যালয়ে উপস্থিত থেকে দাবি করেন, বিজেপি এবার নিশ্চিতভাবে জিতবে। তিনি বলেন, রাজ্যে প্রথমবারের মতো “গুণ্ডামুক্ত ভোট” হয়েছে এবং ভোটাররা ভয়ভীতির বাইরে এসে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পেরেছেন।
অমিত শাহ আরও দাবি করেন, প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার কারণে ভোট প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ হয়েছে এবং এই পরিবেশেই জনগণের প্রকৃত মতামত প্রকাশ পাবে। তার মতে, এত উচ্চ ভোটদানের হার প্রমাণ করে যে মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিচ্ছে।
প্রথম দফার ভোটে রেকর্ড সংখ্যক ভোট পড়েছে, যা স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে সর্বোচ্চ বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ৯১ শতাংশেরও বেশি ভোট পড়ায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। বিজেপি এই উচ্চ ভোটদানের ব্যাখ্যা করছে সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ হিসেবে, অন্যদিকে তৃণমূল বলছে এটি তাদের প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দলই নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা দিচ্ছে। একদিকে তৃণমূল আগাম জয়ের বার্তা দিয়ে কর্মী-সমর্থকদের মনোবল ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে বিজেপি “পরিবর্তনের ঢেউ” তৈরি করার চেষ্টা করছে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার এক জনসভায় বলেন, তিনি জনগণের মনোভাব বুঝতে পারছেন এবং তার মতে দল ইতিমধ্যেই “চালকের আসনে” রয়েছে। তার দাবি, জনগণ ঝুঁকি নিতে রাজি না হয়ে বিপুল সংখ্যায় ভোট দিয়েছে।
তিনি ভোটার তালিকা সংশোধন ও কিছু নাম বাদ যাওয়ার বিষয়টিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ভোটারদের বড় অংশ এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং ভোট দিয়েছে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগও বাড়ছে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ভোটার তালিকায় হেরফের করা হয়েছে, যার ফলে প্রকৃত ভোটাররা ক্ষুব্ধ হয়ে ভোট দিয়েছেন। বিজেপির পক্ষ থেকে আবার দাবি করা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে চলা সহিংসতা ও রাজনৈতিক দখলদারিত্ব থেকে মানুষ মুক্তি চাইছে।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার ভোট এখন শুধুমাত্র একটি নির্বাচনী ধাপ নয়, বরং দুই দলের জন্যই রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চে পরিণত হয়েছে। ফলাফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত এই টানটান উত্তেজনা আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
৪ মে পর্যন্ত অপেক্ষা ছাড়া এখন নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, শেষ পর্যন্ত কার দাবি সত্য হবে—তৃণমূলের আগাম বিজয় ঘোষণা, নাকি বিজেপির “পরিবর্তনের ঢেউ”।