চট্টগ্রামে তীব্র লোডশেডিং, ২৮ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১০টি বন্ধ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৫ এপ্রিল- চট্টগ্রামে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে। নগর ও গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী লোডশেডিং তুলনামূলকভাবে কম দেখানো হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) বিতরণ অঞ্চলের ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে বর্তমানে ১০টি কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে কিছু কেন্দ্র জ্বালানি সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ, আবার কিছু কেন্দ্র আংশিকভাবে চালু থাকলেও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না। ফলে সামগ্রিক উৎপাদন ক্ষমতা অর্ধেকে নেমে এসেছে।
২০ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে অফ-পিক সময়ে ২ হাজার ১৫২ দশমিক ৭০ মেগাওয়াট এবং পিক সময়ে ২ হাজার ৩৪৯ দশমিক ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। অথচ এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি। অর্থাৎ সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন অনেক কম থাকায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং সেটিই লোডশেডিংয়ের মূল কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের তথ্যমতে, পিক আওয়ার অর্থাৎ বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টার মধ্যে চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে, আর এই সময়েই সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। অফ-পিক সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
নগরীর বহদ্দারহাট এলাকার শিক্ষার্থী মরিয়ম আক্তার জানান, দিনে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে এবং মোট ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। তাঁর মতে, রাতের লোডশেডিংয়ের কারণে পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী জানিয়েছেন, এসএসসি পরীক্ষার সময়ে লোডশেডিং না দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, এই সময়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও পরীক্ষার পরিবেশ দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে গরমও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন ২৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, সামনে তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেসরকারি ও সরকারি কয়েকটি কেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। বারাকা ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্র সকালবেলা বন্ধ থাকলেও রাতে চালু থাকে। দোহাজারি ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রও আংশিকভাবে চালু রয়েছে। অন্যদিকে জুডিয়াক, জুলদা-২ ও জুলদা-৩ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে দুটি চালু থাকলেও উৎপাদন সীমিত। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে রাউজানের ৪২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি ইউনিটই বন্ধ রয়েছে।
রাউজান তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী জানান, একটি ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে যান্ত্রিক ত্রুটিতে বন্ধ এবং অন্যটি গ্যাস সংকটে চালু করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, গ্যাস সরবরাহ না পেলে এই ইউনিট থেকে সর্বোচ্চ ১৮০ মেগাওয়াট উৎপাদন সম্ভব হলেও বর্তমানে তা সম্ভব হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ বিতরণ অঞ্চল (দক্ষিণ) চট্টগ্রামসহ কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে গঠিত। এই অঞ্চলে দৈনিক চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট হলেও জাতীয় গ্রিড থেকে তা পূরণ করা যাচ্ছে না।
গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে দৈনিক ৩৭ থেকে ৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্য কেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ সীমিত থাকায় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী পরিচালক জানান, ২০ এপ্রিল চাহিদার তুলনায় অফ-পিক সময়ে ৬৭ মেগাওয়াট এবং পিক সময়ে ১০৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল। এই ঘাটতিই মূলত নগর ও গ্রামে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং তৈরি করছে।
চট্টগ্রামের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটকে বিশেষজ্ঞরা জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন কেন্দ্রের অকার্যকারিতা এবং জাতীয় গ্রিডের ভারসাম্যহীন সরবরাহের ফল হিসেবে দেখছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে গরমের মৌসুমে সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।