ইসলামী ব্যাংক। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ মে- দেশের অন্যতম বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে ব্যাপক ছাঁটাই ও নতুন নিয়োগকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংকটি প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেছে, যার মধ্যে প্রায় ৮ হাজারই চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা।
চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, এই গণছাঁটাই প্রক্রিয়াটি কোনো স্বচ্ছ নীতিমালা বা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ভিত্তিতে হয়নি, বরং একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল ও রাজনৈতিক ঘরানাকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ এই পরিবর্তনকে “সুপরিকল্পিত রিপ্লেসমেন্ট” হিসেবে উল্লেখ করছেন।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন ধাপে ব্যাংকটি ৮ হাজার ৫০০ জন কর্মকর্তা এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন কর্মচারীকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়। এর মধ্যে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা কর্মীদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। বাকি চাকরিচ্যুতদের মধ্যে নোয়াখালী, কুমিল্লা, সিলেট, বগুড়া এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার কর্মীরাও রয়েছেন।
চাকরিচ্যুতদের মধ্যে অনেকেই অভিযোগ করেছেন, তারা দীর্ঘদিন ব্যাংকে দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে কাজ করলেও কোনো ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাড়াই তাদের চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
হালিশহর শাখার সাবেক জুনিয়র অফিসার সেকান্দর হায়াত আরমান বলেন, তিনি যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পেয়েছিলেন এবং স্বল্প সময়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করেছিলেন। তার দাবি, “আমি ব্যাংকের জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছি, কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।”
অন্যদিকে সাতকানিয়ার বাসিন্দা তারেক আজিজ জানান, তার কিডনি রোগে আক্রান্ত সন্তানের চিকিৎসা চলছিল, কিন্তু চাকরি হারানোর পর আর্থিক সংকটে সেই চিকিৎসাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
একই উপজেলার দুই ব্যাংকারের মা সাফিয়া বেগম বলেন, তার দুই সন্তানই ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত হয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, নিয়ম মেনে নিয়োগ পাওয়া এবং ভালো পারফরম্যান্স থাকা সত্ত্বেও তাদের হঠাৎ করে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা পুরো পরিবারকে চরম সংকটে ফেলেছে।
আনোয়ারা উপজেলার আরেক চাকরিচ্যুত কর্মকর্তার পরিবার দাবি করেছে, তাদের সন্তান কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে চাকরি হারিয়েছে।
ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একটি বিশেষ মূল্যায়ন পরীক্ষা নেয়। এতে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের বড় অংশকে উত্তীর্ণ দেখানো হলেও পরবর্তীতে ভিন্নমতাবলম্বী ও দক্ষ কর্মীদের চাকরিচ্যুত করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি পরীক্ষায় অংশ না নেওয়াকে “শৃঙ্খলাভঙ্গ” হিসেবে বিবেচনা করে শতাধিক কর্মীকে সরাসরি চাকরিচ্যুত করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ২৮ সেপ্টেম্বর একদিনেই প্রায় ৫ হাজার কর্মীকে অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি (ওএসডি) করা হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, তাদের কোনো পূর্ব নোটিশ দেওয়া হয়নি এবং অনেকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও আইডি অ্যাকসেস বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই একের পর এক চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়া চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান এবং পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
অন্যদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, মাত্র ২৫৩ দিনের মধ্যে ৬ হাজার ২১৮ জন নতুন জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই মৌখিক ও এমসিকিউয়ের মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। নিয়োগে রাজনৈতিক সুপারিশ ও দলীয় প্রভাবের অভিযোগও তুলেছেন একাধিক কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এই প্রক্রিয়ায় কর্মী ছাঁটাইয়ের চেয়ে মূল লক্ষ্য ছিল জনবল প্রতিস্থাপন।
এদিকে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানকে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংকের এই ছাঁটাই ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আর্থিক খাতসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সূত্রঃ খবরের কাগজ