সংগ্রাম, সংগীত আর স্বপ্নের গল্প: ওটিএন বাংলার মুখোমুখি সিঁথি সাহা
মেলবোর্ন, ১৬ মে: বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের পরিচিত মুখ সিঁথি সাহা। রবীন্দ্রসংগীত, আধুনিক ও লোকগানের মেলবন্ধনে তিনি তৈরি করেছেন নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়। ছোটবেলা থেকেই মায়ের কাছ থেকে…
মেলবোর্ন, ১৬ মে- ইন্দোনেশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে গত মাসে চীনের তৈরি একটি পানির নিচের নজরদারি যন্ত্র উদ্ধার হওয়া সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের জন্য খুব একটা বিস্ময়ের বিষয় ছিল না। তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই ঘটনাটি অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা কৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।
চীন দীর্ঘদিন ধরেই সমুদ্রের নিচের পরিবেশ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে। এর একটি বড় উদ্যোগ হলো “ট্রান্সপারেন্ট ওশান প্রোগ্রাম” বা স্বচ্ছ মহাসাগর কর্মসূচি।
নৌ কৌশল বিশ্লেষক জেনিফার পার্কার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পানির নিচে যুদ্ধ সক্ষমতা, বিশেষ করে সাবমেরিন ব্যবহার ও চীনা সাবমেরিন শনাক্ত করার ক্ষমতা, চীন নিজের জন্য একটি কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে দেখে, যা তারা কাটিয়ে উঠতে চায়।
তার মতে, চীন সমুদ্রের নিচের পরিবেশ সম্পর্কে গভীর ধারণা তৈরি করছে, যাতে পানির ভেতরে কী ঘটছে এবং সাবমেরিন কোথায় আছে তা শনাক্ত করা যায়।

লম্বক প্রণালী। ছবিঃ সংগৃহীত
লম্বক প্রণালীতে পাওয়া যন্ত্র
৩.৭ মিটার লম্বা টর্পেডোর মতো দেখতে এই যন্ত্রটি ইন্দোনেশিয়ার লম্বক প্রণালীর কাছে এক জেলের জালে ধরা পড়ে। এই প্রণালীটি এমন কয়েকটি গভীর সমুদ্রপথের একটি, যেখান দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার জলসীমা ও দক্ষিণ চীন সাগরের মধ্যে সাবমেরিনগুলো ভেসে না উঠে চলাচল করতে পারে।
স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালাইসিস অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা প্রধান মার্কাস হেলিয়ার বলেন, চীনের এই উদ্যোগ প্রথমে নিজ দেশের আশপাশের এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদেশগুলোর সাবমেরিন শনাক্ত করার লক্ষ্যেই শুরু হয়েছিল। বিশেষ করে তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতের সময় এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু এখন চীন তাদের নৌবাহিনীকে “ব্লু-ওয়াটার নেভি” বা মহাসাগরজুড়ে অভিযান চালাতে সক্ষম শক্তিতে পরিণত করছে। এর ফলে তাদের দূরবর্তী সমুদ্র অঞ্চলেও পানির নিচের তথ্য জানা প্রয়োজন হচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্ট ওশান প্রকল্প চীনের গভীর সমুদ্র জ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়নের বৃহৎ উদ্যোগের অংশ। পাশাপাশি এটি সমুদ্রের নিচের খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানেও কাজে লাগানো হচ্ছে। ছবিঃ সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল ওয়ার কলেজের গবেষক রায়ান মার্টিনসন বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর থেকেই গভীর সমুদ্র গবেষণা একটি অগ্রাধিকারমূলক বিষয়।
তার মতে, ট্রান্সপারেন্ট ওশান প্রকল্প চীনের গভীর সমুদ্র জ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়নের বৃহৎ উদ্যোগের অংশ। পাশাপাশি এটি সমুদ্রের নিচের খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানেও কাজে লাগানো হচ্ছে।
চীনা সমুদ্রবিজ্ঞানী উ লিক্সিন ২০১৪ সালে এই কর্মসূচির ধারণা দেন। এতে প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম অংশ, ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরকে ঘিরে একটি ত্রিমাত্রিক রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ার পরিকল্পনা করা হয়।
এই ব্যবস্থায় থাকবে স্যাটেলাইট, স্বয়ংক্রিয় জাহাজ, পানির নিচের ড্রোন এবং সমুদ্রতল সেন্সর নেটওয়ার্ক। সব তথ্য একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক “ডিপ ব্লু ব্রেইন” দ্বারা বিশ্লেষণ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সামরিক ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ
যদিও এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে আবহাওয়া পূর্বাভাস ও জলবায়ু গবেষণার কথা বলা হয়, অনেক বিশ্লেষক মনে করেন চীনের “মিলিটারি-সিভিল ফিউশন” নীতির কারণে এসব তথ্য সেনাবাহিনীর কাছেও পৌঁছায়।
বিশেষজ্ঞ মার্টিনসনের মতে, এই প্রকল্প মূলত এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করছে যা সমুদ্রের ভেতরের পরিবেশ সম্পর্কে বাস্তব সময়ের তথ্য দেবে, যা সাবমেরিন যুদ্ধ ও অ্যান্টি-সাবমেরিন কৌশলে ব্যবহৃত হতে পারে।
সামরিক বিশ্লেষক পিটার সিঙ্গার ও টাই গ্রাহাম মনে করেন, চীনের লক্ষ্য একটি “অদৃশ্য নেটওয়ার্ক” তৈরি করা, যা শত্রুপক্ষের সাবমেরিনের চলাচল সীমিত করতে পারে।

ইন্দোনেশিয়ার লম্বক প্রণালীতে চীনা নজরদারি যন্ত্র। ছবিঃ সংগৃহীত
যন্ত্রটির প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো অজানা
ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী জানিয়েছে, উদ্ধার করা যন্ত্রটি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি নৌঘাঁটিতে নেওয়া হয়েছে। তবে এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যায়নি এটি কে স্থাপন করেছে বা কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছিল।
চীন অবশ্য এই বিষয়ে বলেছে, সমুদ্র গবেষণা যন্ত্র বিভিন্ন কারণে অন্য দেশের জলসীমায় ভেসে যেতে পারে এবং এতে অতিরিক্ত সন্দেহ করার কিছু নেই।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এটি একটি ডিপ-সি রিয়েল-টাইম ট্রান্সমিশন সিস্টেম, যা তাপমাত্রা, গভীরতা, স্রোত এবং শব্দের মতো তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম।
অস্ট্রেলিয়া ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের প্রযুক্তি অস্ট্রেলিয়া ও তার মিত্রদের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
চীনের নৌবাহিনী এখন মহাসাগরের আরও দূরবর্তী অঞ্চলে সক্রিয় হচ্ছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনা সাবমেরিনের উপস্থিতি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লম্বক প্রণালীতে পাওয়া এই যন্ত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে যে চীন সাবমেরিন চলাচল পর্যবেক্ষণ বা নিজস্ব নৌ সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এই অঞ্চল ব্যবহার করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার জলসীমায় সম্ভাব্য নজরদারি
চীনের সেন্সর নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত, তা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে ধারণা করা হচ্ছে, অতীতে অস্ট্রেলিয়ার জলসীমায় চীনা গবেষণা জাহাজগুলো কিছু নজরদারি যন্ত্র বসিয়ে থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্র বিশাল হওয়ায় এসব কার্যক্রম শনাক্ত করা কঠিন, তবে পুরোপুরি অসম্ভব নয়।
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জেনিফার পার্কার বলেন, এ ধরনের যন্ত্র বসানো চীনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, তবে ছোট ড্রোন বা সেন্সর ফেলে দেওয়া তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
প্রতিরক্ষা কৌশলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির কারণে সাবমেরিনের পুরনো ধরনের “অদৃশ্যতা” বা স্টেলথ সুবিধা কমে আসছে।
ফলে ভবিষ্যতে সাবমেরিনগুলোকে শুধু যুদ্ধজাহাজ নয়, বরং ড্রোন পরিচালনার “মাদারশিপ” হিসেবেও ব্যবহার করতে হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির বর্তমান সাবমেরিন পরিকল্পনা ও আউকাস কর্মসূচি ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে।
তাদের মতে, ভবিষ্যতে সমুদ্রযুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে “শত্রুকে দেখা ও শনাক্ত করা”, কারণ একবার লক্ষ্য শনাক্ত হলে তাকে আঘাত করা সহজ হয়ে যায়।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, আগামী দশকে পানির নিচের যুদ্ধ সক্ষমতা ও মানববিহীন সামুদ্রিক ব্যবস্থায় বিপুল বিনিয়োগ পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে কয়েক বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হতে পারে সাবমেরিন যুদ্ধ ও ড্রোন প্রযুক্তির জন্য।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বিশ্ব সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন যুগে প্রবেশ করাচ্ছে, যেখানে পানির নিচের তথ্যই ভবিষ্যতের শক্তির মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠবে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au