ইসলা বেলের মৃত্যুর বিচারের দাবিতে রাস্তায় শত মানুষ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৬ মে- অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ১৯ বছর বয়সী তরুণী আইলা বেলের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা ও অনিচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগ প্রত্যাহার করায় গভীর ক্ষোভ, হতাশা ও বিচারহীনতার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভে নেমেছেন তাঁর পরিবার, বন্ধু ও সমর্থকেরা। শনিবার মেলবোর্নের কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক এলাকার স্টেট লাইব্রেরির সামনে আয়োজিত সমাবেশে কয়েকশ মানুষ অংশ নেন। তাঁদের হাতে ছিল আইলার ছবি, ফুল ও প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড।
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আইলার মা জাস্টিন স্পোকস। তিনি বলেন, অভিযোগ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত তাঁদের পরিবারকে ভেঙে দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, “মনে হচ্ছে যেন আমার মেয়ের সঙ্গে আমাকেও আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেওয়া হয়েছে। বিচারব্যবস্থার ওপর যে সামান্য আস্থা ছিল, সেটিও এখন নষ্ট হয়ে গেছে।”
পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে ড্যান্ডেনংয়ের একটি বর্জ্য ডিপোতে আবর্জনাবাহী ট্রাকের ভেতর থেকে আইলা বেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহটি একটি ফ্রিজের ভেতরে রাখা ছিল। এর প্রায় ছয় সপ্তাহ আগে ব্রান্সউইকের নিজ বাসা থেকে বের হওয়ার পর তিনি নিখোঁজ হন। পরে জানা যায়, সর্বশেষ তাঁকে জীবিত অবস্থায় দেখা গিয়েছিল অভিযুক্ত মারাত গ্যানিয়েভের সেন্ট কিল্ডা ইস্ট এলাকার অ্যাপার্টমেন্টে।
প্রথমে ৫৫ বছর বয়সী মারাত গ্যানিয়েভের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হলেও পরে তা অনিচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগে নামিয়ে আনা হয়। চলতি মাসে মামলার বিচার শুরুর কথা ছিল। তবে ভিক্টোরিয়া সুপ্রিম কোর্টে প্রসিকিউটররা জানান, পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে ওই অভিযোগ প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
অফিস অব পাবলিক প্রসিকিউশনের এক মুখপাত্র বলেন, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি আইলার মৃত্যু কীভাবে হয়েছে কিংবা শরীরের আঘাতগুলো মৃত্যুর আগে না পরে হয়েছিল। ফলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দণ্ড নিশ্চিত হওয়ার যৌক্তিক সম্ভাবনা পাওয়া যায়নি।
তবে মারাত গ্যানিয়েভের বিরুদ্ধে এখনো বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত করার চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে মরদেহ রাখা ফ্রিজ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত ৫৯ বছর বয়সী ইয়াল ইয়াফের বিরুদ্ধেও অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তিনি আদালত থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
সমাবেশে আইলার মা জাস্টিন স্পোকস বলেন, অভিযোগ কেন প্রথমে কমানো হলো এবং পরে পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হলো, সেটি পরিবারকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি। তিনি অস্ট্রেলিয়ার অ্যাটর্নি-জেনারেল সোনিয়া কিলকেনির হস্তক্ষেপ কামনা করেন এবং বিচারব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানান।
তিনি লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার সংবাদ প্রকাশে ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ বা ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার প্রবণতা ঠেকাতে ট্রমা-সচেতন জাতীয় গণমাধ্যম নীতিমালা চালুর আহ্বানও জানান। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় পারিবারিক ও যৌন সহিংসতা বিষয়ক রয়্যাল কমিশনের সুপারিশ অনুসরণ করে নতুন আইন প্রণয়নের দাবি তোলেন তিনি।
আইলার দাদা ডেভিড স্পোকসও বিচারব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “সারা জীবন বিশ্বাস করেছি বিচারব্যবস্থা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। এখন মনে হচ্ছে, এই ব্যবস্থাই ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।”
সমাবেশে অংশ নেওয়া আইলার শৈশবের বন্ধু মিয়া ও কিরা তাঁকে স্মরণ করে বলেন, আইলা ছিলেন প্রাণবন্ত, সাহসী ও সৃজনশীল একজন তরুণী। ছবি আঁকা ও হেনা শিল্পে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। কিরা বলেন, “এই সিদ্ধান্তে আমি ভীষণ রাগ ও কষ্টে ভেঙে পড়েছি।” আর আইন বিষয়ে পড়াশোনা করা মিয়া বলেন, “এই ঘটনা বিচারব্যবস্থার ওপর আমাদের প্রজন্মের আস্থা নষ্ট করে দিয়েছে।”
আইলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আইসি বলেন, “এই ঘটনা মেয়েদের জন্য কী বার্তা দেয়? আমরা কি তাহলে শুধু ফেলে দেওয়ার মতো মানুষ? এই ভাবনাই আমাকে ভীষণ মর্মাহত করছে।”
সূত্রঃ এবিসি নিউজ