গুরুতর আহত অতিরিক্ত সচিব
মেলবোর্ন, ৩০ মে- পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য শামীমুজ্জামান ফিরোজ। শুক্রবার (২৯…
মেলবোর্ন, ২৯ মে- ঢাকার মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গুরুতর গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। তদন্তে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডের অবকাঠামোগত ত্রুটিসহ একাধিক অনিয়ম ধরা পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. জাহিদ রায়হান।
শুক্রবার সকালে গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, সরকারের গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে ঘটনার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করেছে। তদন্তে হাসপাতালের দায়িত্বে অবহেলা ও ত্রুটির বিষয় সামনে এসেছে। এই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আগামীকাল জমা দেওয়া হবে।
ঘটনাটি নিয়ে রাজধানীর রমনা থানায় একটি মামলাও হয়েছে। মামলায় অবহেলাজনিত কারণে শিশু মৃত্যুর অভিযোগ আনা হয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। নিহত এক নবজাতকের বাবা হাবিবুর রহমান বুধবার রাতে মামলাটি দায়ের করেন। পরে বৃহস্পতিবার সেটি নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।
রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশিক ইকবাল জানান, এজাহারে কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি। আসামি হিসেবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে, তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
গত বুধবার সকালে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ডেলিভারির পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। নবজাতকদের বয়স ছিল এক থেকে তিন দিনের মধ্যে। কী কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে, সেটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হলেও একাধিক সম্ভাব্য কারণ নিয়ে তদন্ত চলছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় ঘটনার পরপরই তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।
নিহত নবজাতকদের স্বজনেরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার গভীর রাতে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে থাকা শিশুদের আচরণ হঠাৎ অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। প্রথমে একটি শিশু কান্নাকাটি শুরু করে। পরে অল্প সময়ের মধ্যেই কক্ষের সব শিশু কান্না শুরু করে। তাদের মধ্যে একটি শিশুর অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে গেলে তাকে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা এনআইসিইউতে নেওয়া হয়।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোরের দিকে একে একে বাকি শিশুদের অবস্থাও গুরুতর হয়ে পড়ে। পরে তাদের সবাইকে এনআইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। কিছু সময় পর চিকিৎসকেরা পরিবারগুলোকে জানান, শিশুরা মারা গেছে।
কয়েকজন স্বজন দাবি করেন, মৃত্যুর সময় কয়েকটি নবজাতকের শরীর নীলচে রং ধারণ করেছিল। এ কারণে তারা বিষাক্ত গ্যাস, অক্সিজেনের ঘাটতি বা পরিবেশগত কোনো সমস্যার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ঘটনার বিষয়ে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, ওই পোস্টডেলিভারি ওয়ার্ডে ১১ জন মা এবং ছয় নবজাতক ছিলেন। শিশুরা নিজ নিজ মায়ের পাশেই ছিল। যেহেতু ওয়ার্ডটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ছিল, তাই রাতের দিকে কয়েকজন মা ঠান্ডা লাগার অভিযোগ করে কর্তব্যরত নার্সদের এসি বন্ধ করতে বলেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসি বন্ধ করার পর রাত চারটার দিকে দুটি শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে তাদের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা প্রাথমিকভাবে জানান, শিশুরা স্থিতিশীল আছে এবং তাদের আবার ওয়ার্ডে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
তিনি আরও বলেন, সকালের দিকে মায়েরা আবারও শিশুদের অসুস্থ মনে হওয়ার কথা জানান। এরপর ছয় শিশুকেই এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে দুটি শিশু নেওয়ার পথেই মারা যায়। বাকি চার শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল এবং তাদের ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর দুপুরের দিকে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডের ওই কক্ষটি সিলগালা করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের ফরেনসিক ইউনিট। তারা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।
এর কিছু সময় পর ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের সদস্যরাও হাসপাতালে যান। তারা কক্ষটিতে কোনো ধরনের ক্ষতিকর বা বিষাক্ত গ্যাস ছিল কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য নমুনা সংগ্রহ করেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ওয়ার্ডের বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, অক্সিজেন সরবরাহ, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের কার্যকারিতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে দায়িত্বরত চিকিৎসক, নার্স এবং কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা জানান, পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডের অবকাঠামোগত কিছু ত্রুটি তদন্তে উঠে এসেছে। সেখানে নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতির বিষয়ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জনমনে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বেসরকারি হাসপাতালগুলোর তদারকি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। বিশেষ করে নবজাতক ও প্রসূতি সেবার মতো সংবেদনশীল বিভাগে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
পরে বিকেলে নিহত নবজাতকদের মরদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। স্বজনেরা ময়নাতদন্তে অনাগ্রহ প্রকাশ করায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং হাসপাতালের অবহেলার মাত্রা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au