দোকানে এসে হিন্দু ব্যবসায়ীর ওপর সংঘবদ্ধ হামলা, নগদ অর্থ ও মোবাইল লুট
মেলবোর্ন, ৫ জুন- বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলায় এক হিন্দু ব্যবসায়ীর ওপর সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগ উঠেছে। হামলাকারীরা ঐ ব্যবসায়ীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে তাকে মারধর ও কুপিয়ে গুরুতর…
মেলবোর্ন, ৪ জুন- রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। ঘটনার তদন্তে চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতাল প্রশাসনের গুরুতর অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সঙ্গে কেন হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হবে না, সে বিষয়ে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালনা শাখার পরিচালক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই নোটিশ জারি করা হয়। এতে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মালিক ডা. শেখ মহিউদ্দিনকে আগামী ৭ জুন বিকেল ৪টার মধ্যে লিখিতভাবে অথবা সশরীরে উপস্থিত হয়ে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৭ মে হাসপাতালে ছয় নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশে ১ জুন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। তদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
তদন্তের অংশ হিসেবে হাসপাতালের মহাপরিচালক, উপপরিচালক, শিশু বিভাগের প্রধান, নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে কর্মরত চিকিৎসক, দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স, আয়া, রোগী ও রোগীর স্বজনদের পাশাপাশি নিহত নবজাতকদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতাল পরিচালনায় ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’-এর একাধিক বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এসব নিয়মের চরম অবহেলা ও ব্যর্থতার কারণেই ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে কমিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল উক্ত অধ্যাদেশের ৮ ধারা অনুযায়ী নিবন্ধিত। তদন্তে আইন লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় বিধি অনুযায়ী কেন হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হবে না, তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
এদিকে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, তদন্তে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, নার্সদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিষয়গুলো তদন্তে উঠে এসেছে। বিদ্যমান প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা হাসপাতাল পরিচালনার মৌলিক শর্ত পূরণে সক্ষম ছিলেন না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ভবনটি চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয়। কমিটি হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষ নম্বর-২ পরিদর্শন করে দেখতে পায়, দীর্ঘ সময় ধরে কক্ষটির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ ছিল এবং সেখানে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কক্ষটির আয়তন প্রায় ৯০০ বর্গফুট হলেও সেখানে রোগী, নবজাতক ও তাদের স্বজনসহ প্রায় ৫০ জন অবস্থান করছিলেন, যা ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
তদন্তে আরও জানা গেছে, নবজাতকদের শারীরিক অবস্থার আকস্মিক অবনতি হলেও হাসপাতালে কোনো জরুরি চিকিৎসা প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা কার্যকর ছিল না। দায়িত্বরত নার্সরা অভিভাবকদের আহ্বানে সাড়া দেননি এবং কোনো চিকিৎসককেও সময়মতো বিষয়টি জানাননি। বরং তারা সময়ক্ষেপণ করেছেন এবং শিশুদের জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেননি।
তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট কক্ষে দায়িত্ব পালনকারী নার্স, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং নিহত শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে সেবিকাদের চরম অবহেলা ও অসহযোগিতার প্রমাণ পেয়েছে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণেরও ঘাটতি ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে রোগীদের তদারকির জন্য কোনো চিকিৎসক দায়িত্বে ছিলেন না। আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি এবং অতিরিক্ত লোকজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও ব্যর্থতা ছিল। এসব কারণে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তার দায় সংশ্লিষ্টদের এড়ানোর সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সরকার পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবে। বিদ্যমান আইনে যে ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে, হাসপাতালের বিরুদ্ধে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগামী রোববারের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
মন্ত্রী আরও বলেন, “আমরা যে ধরনের কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছি, তাতে ভবিষ্যতে আর কেউ কোনো শিশু বা সাধারণ মানুষকে বদ্ধ ঘরে এভাবে ঝুঁকির মধ্যে রাখার সাহস করবে না। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার দিন শেষ।”
তিনি জানান, এ ঘটনার পর দেশের সব বেসরকারি হাসপাতালের ওপর বিশেষ নজরদারি শুরু হয়েছে। বিভাগীয় পরিচালক, জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল বৈঠকের মাধ্যমে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন হাসপাতালের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ভবন পরিদর্শন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ময়নাতদন্ত প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, নিহত নবজাতকদের পরিবারের সদস্যরা গভীর শোকাহত থাকায় এবং মায়েদের আবেগজনিত কারণে পুলিশ ও সিআইডির প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ময়নাতদন্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে তদন্তে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে তিনি মনে করেন এবং আদালত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।
হাসপাতালটির ভবন সংক্রান্ত বিষয়েও তদন্তে নতুন তথ্য উঠে এসেছে। মন্ত্রী জানান, হাসপাতালটির প্রাথমিক অনুমোদন থাকলেও পরবর্তীতে ভবনের বিভিন্ন অংশে আইনবহির্ভূত পরিবর্তন আনা হয়েছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) একটি প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। এমনকি ভবনের নবম তলায় একটি বেকারি পরিচালনার বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে। এ বিষয়ে রাজউক পৃথক ব্যবস্থা নেবে বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, গত ২৭ মে সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au