মেলবোর্ন, ২২ জুন- খুন, ধর্ষণ, মব সহিংসতা, গণপিটুনি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের ঘটনা দেশে উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো স্থানে সংঘটিত এসব ঘটনা জনমনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। মানবাধিকারকর্মী, অপরাধ বিশ্লেষক এবং সাধারণ নাগরিকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি এখনো সন্তোষজনক নয়। বিশেষ করে মব সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং প্রকাশ্যে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে সংঘবদ্ধভাবে মানুষকে পিটিয়ে হত্যার পাশাপাশি কবর থেকে মরদেহ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটেছে। ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব কমই দেখা গেছে। বর্তমান সরকারের সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন মামলায় জামিনে মুক্তি পাওয়া একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও দাগি অপরাধী আবারও চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত হন এক সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। ২০০১ সালে প্রকাশিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় তার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকাও অপরাধের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। সেখানে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, ছিনতাই এবং কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষ প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত ১২ এপ্রিল দুই কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে নিহত হন অ্যালেক্স গ্রুপের নেতা মো. ইমন ওরফে অ্যালেক্স ইমন। এর মাত্র চার দিনের মাথায় একই এলাকায় আরও এক যুবক খুন হন।
মব সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত ৩ মে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় ট্রাকচাপায় কয়েকজন নিহত হওয়ার গুজব ছড়িয়ে হান্নান শেখ নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই মাসের ৯ মে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গরু চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে প্রাণ হারান তিন ব্যক্তি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখাতে পারলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও তা স্থিতিশীল রাখা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তার মতে, অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা হচ্ছে, এমনকি অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়েই ফিরে আসতে হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক প্রবণতা।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে সারা দেশে খুনের ঘটনায় এক হাজার ৪৫২টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের সাত হাজার ৯১০টি, অপহরণের ৪৩৭টি, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ৮৫৮টি এবং মাদক-সংক্রান্ত ২৬ হাজার ১৪১টি মামলা হয়েছে। চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে চার হাজার ৯১২টি।
তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের একই সময়ে খুনের মামলা হয়েছিল এক হাজার ৫৮৭টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ছিল নয় হাজার ১০০টি এবং চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ছিল চার হাজার ৯৫৫টি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যানও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ১৯৮টি মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় ১০২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু এপ্রিল মাসে ৪৪টি ঘটনায় ২২ জন এবং মে মাসে ৬৬টি ঘটনায় ৩১ জন প্রাণ হারান।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, একই সময়ে ৭৭২টি রাজনৈতিক সংঘর্ষে ৯৬ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া এক হাজার ২৬৯ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৯৮ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। বিভিন্ন কারণে প্রাণ হারিয়েছে ২৫১ শিশু।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৮৯ জন। একই সময়ে ২৩৯ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৮৫ জনের ওপর। ধর্ষণের ঘটনায় ২৬ নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পাঁচ মাসে এক হাজার ৩৫ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৫১ জন শিশু এবং ৫৮৪ জন নারী। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৫০ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৮ জনকে। এছাড়া বিভিন্ন ঘটনায় ২৩৭ নারী ও শিশু নিহত হয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। গত মে মাসে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১৩টি ঘটনায় র্যাব, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ২০ মে রাজধানীর কালশীতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানে গেলে পুলিশের ওপর হামলা হয়। পরদিন চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা ছয় ঘণ্টা পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখে এবং একটি পুলিশ পিকআপে আগুন ধরিয়ে দেয়।
২২ মে সিলেটে এক মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে র্যাব সদস্য ইমন আচার্য নিহত হন। এর দুই দিন আগে চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারান এক পুলিশ সদস্য।
মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক সদস্য এখনো পুরোপুরি মনোবল ফিরে পাননি। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জটিল পরিস্থিতিতে পড়লে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পূর্ণ সমর্থন পাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষও। কুমিল্লায় কর্মরত এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই ছিনতাইয়ের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে অপরাধীদের হাতে চাপাতি ও আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। এসব ঘটনা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়াচ্ছে।
রাজধানীর পল্লবীর বাসিন্দা ফেরদৌস সুলতান বলেন, অপরাধপ্রবণতা যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রকাশ্যে খুন, গুলি এবং নারী ও শিশুদের ওপর নির্মম নির্যাতনের ঘটনা মানুষের মনে ভয় সৃষ্টি করছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আবদুর রহিমের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো মব সন্ত্রাস। তিনি বলেন, কোনো ঘটনা ঘটলেই শত শত মানুষ জড়ো হয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং গণপিটুনিতে জড়িয়ে পড়ছে। আইনের শাসনের পরিবর্তে মানুষ নিজেরাই বিচারক হয়ে উঠছে, যা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়।
মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও সামগ্রিক চিত্র এখনো উদ্বেগমুক্ত নয়। বিশেষ করে মব সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনা জনমনে গভীর শঙ্কা তৈরি করছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারে।
তবে পরিস্থিতির উন্নতির দাবি করছে পুলিশ। পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। তবে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা, মব কালচার এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। মানবাধিকার বিবেচনায় পুলিশ আগের তুলনায় বেশি সংযত আচরণ করছে, আর সেই সুযোগে কিছু অপরাধী তৎপর হওয়ার চেষ্টা করছে। তারপরও পরিস্থিতির উন্নয়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করা, মব সহিংসতা প্রতিরোধ এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে নারী, শিশু এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন রাষ্ট্রের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।