বাংলাদেশ

এসএসসি পাস করেও এইচএসসিতে নেই সাড়ে ৫ লাখ, কোথায় হারাচ্ছে শিক্ষার্থীরা?

  • 2:06 pm - July 06, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৬ বার
এসএসসি পাস করেও এইচএসসিতে নেই সাড়ে ৫ লাখ।ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৬ জুলাই-  দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। গত দুই বছরে এসএসসি বা সমমান পাস করে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। শিক্ষাবিদদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি, দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম এবং শিক্ষা ব্যয়ের চাপসহ নানা কারণে এই ঝরে পড়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ শিক্ষার্থীর। এর মধ্যে ২৪ হাজার ৭৮৪ জন পরীক্ষায় অনুপস্থিত রয়েছে। তবে আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফরমই পূরণ করেনি। ফলে তারা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারিয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, অতীতে এসএসসির পর সাধারণত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়লেও এবার পরিস্থিতি অনেক বেশি উদ্বেগজনক। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ৩৩ শতাংশ, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে প্রায় ৪৪ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে প্রায় ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতির কারণ খুঁজে বের করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত ছিল ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন। অর্থাৎ প্রায় ৩ লাখ ৯২ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষার বাইরে চলে গেছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে আলিম প্রথম বর্ষে নিবন্ধিত ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৬২ হাজার শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেনি। একইভাবে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে নিবন্ধিত ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি, যা সব বোর্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ ঝরে পড়ার হার।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এটি শুধু দুই বছরের সমস্যা নয়। করোনাভাইরাস মহামারির পর সৃষ্ট শিখন ঘাটতি এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এর সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় ঘন ঘন পরিবর্তন, শিক্ষাঙ্গনে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা এবং সামাজিক নানা সংকট শিক্ষার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

তার মতে, অনেক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পাস করার পর আর উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয় না। আবার অনেকে ভর্তি হলেও আর্থিক সংকট, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা অন্যান্য কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। কেউ জীবিকার জন্য কাজে যুক্ত হয়, কেউ টেস্ট পরীক্ষার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, আবার কেউ নিবন্ধন করেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেয় না।

রাশেদা কে চৌধুরী আরও বলেন, বাল্যবিয়ে এবং শিশুশ্রম শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। একই সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা এখনো পুরোপুরি ব্যয়মুক্ত না হওয়ায় দরিদ্র পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি পর্যায়ক্রমে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালুর পরামর্শ দেন।

শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং অনেক পরিবারের আয় কমে যাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না। অনেক পরিবার বড় শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনও ব্যাহত হয়েছে।

তার মতে, বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা এখনো শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের জন্য পর্যাপ্তভাবে প্রস্তুত করতে পারছে না। ফলে প্রান্তিক পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে পড়াশোনা বন্ধ করে জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হওয়াই বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হয়ে উঠছে।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকতে হয়েছে। এর প্রভাব এখনো কাটেনি। অনেক শিক্ষার্থী আত্মবিশ্বাস হারিয়ে পরীক্ষার আগেই পড়াশোনা থেকে সরে যাচ্ছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ‘ব্যাক টু স্কুল’ কর্মসূচি, দরিদ্র পরিবারের জন্য উপবৃত্তি বৃদ্ধি, মেয়েশিশুদের বিশেষ সহায়তা, শিক্ষা ব্যয় কমানো এবং শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে যাওয়ার বাস্তবসম্মত সুযোগ তৈরি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শিক্ষার মানের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এই শাখার আরও খবর

ভুল প্রশ্নে এইচএসসি পরীক্ষা: গাইবান্ধায় কেন্দ্র সচিবসহ ৯ কর্মকর্তাকে অব্যাহতি

মেলবোর্ন, ৭ জুলাই- গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায় একটি এইচএসসি পরীক্ষাকেন্দ্রে ২০২৬ সালের পরীক্ষার্থীদের ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার ঘটনায় কেন্দ্র সচিব, ট্যাগ অফিসার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকসহ…

গাজার শাসনভার ছেড়ে দিল হামাস

মেলবোর্ন, ৭ জুলাই- গাজা উপত্যকায় প্রায় দুই দশকের শাসনের পর নিজেদের প্রশাসনিক কমিটি বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিয়েছে হামাস। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গাজার বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব একটি…

এআইয়ের ধাক্কায় মাইক্রোসফটে বড় ছাঁটাই, চাকরি হারাচ্ছেন ৪৮০০ কর্মী

মেলবোর্ন, ৭ জুলাই-  কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক ব্যয় কমিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট বড়…

পশ্চিমবঙ্গে শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, গণপিটুনিতে নিহত সন্দেহভাজন

মেলবোর্ন, ৭ জুলাই- ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় ১২ বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। শিশুটিকে ধর্ষণের পর…

লন্ডনে বৈঠকে বসছেন পলিন হ্যানসন ও নাইজেল ফারাজ, ডানপন্থী রাজনীতির কৌশল নিয়ে আলোচনা

মেলবোর্ন, ৭ জুলাই-  অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যে ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় দুই দেশের আলোচিত নেতা পলিন হ্যানসন ও নাইজেল ফারাজ লন্ডনে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন।…

ভার্জিনিয়া জিউফ্রের মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি পরিবারের, করোনিয়াল ইনকোয়েস্টের আবেদন

মেলবোর্ন, ৭ জুলাই-  যৌন নিপীড়ন ও মানবপাচার মামলার অন্যতম আলোচিত ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জিউফ্রের মৃত্যুর ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে তার পরিবার। তারা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au