উগ্রবাদী পোস্টের অভিযোগে সিঙ্গাপুরে দুই বাংলাদেশির ওয়ার্ক পারমিট বাতিল।ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৮ জুলাই- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্রবাদ সমর্থন ও বিভেদমূলক পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে সিঙ্গাপুরে কর্মরত দুই বাংলাদেশি নাগরিকের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করেছে দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ (আইএসডি)। তদন্ত শেষে তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। পরে ঢাকায় পৌঁছানোর পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাঁদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।
দ্য স্ট্রেইটস টাইমস–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়ার্ক পারমিট বাতিল হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন রিশাদ তায়ানী (২৫) ও সাহেদুল ইসলাম (৩৭)। আইএসডি জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের প্রকাশিত বিভিন্ন পোস্টের ভিত্তিতে জুলাই মাসে পৃথকভাবে তদন্ত চালানো হয়। তদন্ত শেষে তাঁদের সিঙ্গাপুরে কাজের অনুমতি বাতিল করে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
আইএসডির এক মুখপাত্র জানান, রিশাদ তায়ানী তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের উগ্র ইসলামপন্থী লেখক শফিউর রহমান ফারাবীর প্রতি সমর্থনসূচক পোস্ট করেছিলেন। ফারাবীর বিরুদ্ধে অতীতে ধর্মনিরপেক্ষ ও নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে সহিংসতার উসকানি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তাঁর সঙ্গে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সম্পর্ক থাকার অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে সাহেদুল ইসলাম ইসরায়েল-ইরান সংঘাত নিয়ে উসকানিমূলক পোস্ট করেন এবং ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টিকারী মন্তব্য প্রকাশ করেন বলে জানিয়েছে আইএসডি। তদন্তে দেখা যায়, তিনি ইসলামী আইনের বিরোধিতাকারী মুসলিমদের ‘কাফের’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
তবে সিঙ্গাপুরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ স্পষ্ট করেছে, এই দুই ব্যক্তি সিঙ্গাপুরে কোনো সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন, এমন কোনো প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায়নি। তবুও তাঁদের উগ্রবাদী ও বিভাজনমূলক মতাদর্শ বহুজাতিক ও বহু ধর্মের সমাজ হিসেবে সিঙ্গাপুরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হওয়ায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
দুই বাংলাদেশিই সিঙ্গাপুরে নির্মাণশিল্পে কর্মরত ছিলেন। বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ জুলাই তাঁরা হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের আটক করেন। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে তিনটি মোবাইল ফোন এবং তিনটি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়।
পরদিন ৯ জুলাই তাঁদের ঢাকার আদালতে হাজির করা হলে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। আবেদনে বলা হয়, সিঙ্গাপুরে অবস্থানকালে জঙ্গিবাদ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে তাঁরা কিছু তথ্য দিয়েছেন। তাঁদের সম্ভাব্য যোগাযোগ, নেটওয়ার্ক এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
আদালতে শুনানির সময় রিশাদ তায়ানী জানান, ২০২৩ সালে শফিউর রহমান ফারাবীকে নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখির কারণেই তিনি সিঙ্গাপুরে তদন্তের মুখোমুখি হন। বিচারক এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি ফারাবীকে হেফাজতে ইসলামের একজন নেতা বলে উল্লেখ করেন।
রিমান্ড মঞ্জুর করার সময় বিচারক বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের উদ্দেশ্যে বলেন, তাঁরা দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠান এবং তাঁদের এমন কর্মকাণ্ডে জড়ানো উচিত নয়।
এর আগে সিঙ্গাপুরে উগ্রবাদ-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে বাংলাদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে একাধিকবার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালে একজন বাংলাদেশি নির্মাণশ্রমিককে সশস্ত্র হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে আটক করা হয়। তদন্তে জানা যায়, তিনি তথাকথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস)–এর প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে দেশে ফিরে হামলার উদ্দেশ্যে অস্ত্র সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছিলেন।
এছাড়া ২০১৬ সালে সিঙ্গাপুরে কর্মরত আট বাংলাদেশিকে আটক করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে ‘ইসলামিক স্টেট ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি গোপন জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ ওঠে। তদন্তে তাঁদের কাছ থেকে অস্ত্র ও বোমা তৈরির নথি উদ্ধার হয় এবং বাংলাদেশে হামলার জন্য অর্থ সংগ্রহের তথ্যও সামনে আসে। একই তদন্তে আরও পাঁচ বাংলাদেশির কাছে জিহাদি বইপত্র পাওয়ায় তাঁদেরও দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল।
এরও আগে ২০১৫ সালে সিঙ্গাপুরে নির্মাণ খাতে কর্মরত ২৭ বাংলাদেশিকে একটি জঙ্গি সংগঠন গঠনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁদেরও বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।
সিঙ্গাপুরের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বলছে, উগ্রবাদ, সহিংস মতাদর্শ ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয় এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দেশটি শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করে এবং এ ধরনের অভিযোগে বিদেশি কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত থাকবে।