নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৪, আহত ৩২
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন…
মেলবোর্ন, ৫ আগস্ট ২০২৬: ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুই বছর পরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। ভারতে অবস্থানরত ৭৮ বছর বয়সী এই নেতা মৃত্যুদণ্ডের রায় ও গ্রেপ্তারের ঝুঁকি সত্ত্বেও দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর এই অবস্থান কেবল ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নয়; বরং রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক থাকা, সমর্থকদের সক্রিয় রাখা এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি প্রচেষ্টা হতে পারে।
২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে শেখ হাসিনা জুলাই মাসে ভারত থেকে পাঠানো এক ই-মেইলে জানান, তিনি সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন।
তিনি লিখেছেন, তাঁকে হত্যা, গ্রেপ্তার কিংবা কারাগারে পাঠানো হতে পারে; তারপরও জনগণ তাঁকে ডাকছে বলে তিনি দেশে ফিরতে চান। তিনি চলতি বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন।
৫ আগস্ট তাঁর দেশত্যাগের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে নয়াদিল্লিতে ‘শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানে টেলিফোনে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদারের মতে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ দলটির সমর্থকদের কাছে তিনি এখনো একটি প্রতীক।
আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এএফপিকে বলেন, শেখ হাসিনা সত্যিই ফিরতে চান। তাঁর দাবি, দলের বহু নেতাকর্মী কোনো অপরাধে যুক্ত না থাকা সত্ত্বেও গ্রেপ্তার হচ্ছেন। ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে তিনি দলের আনুগত্যের প্রতিদান হিসেবেও দেখছেন।
ঢাকার দৈনিক প্রথম আলো শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণাকে দলীয় নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করা, আওয়ামী লীগের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য চাপ সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক পরিসর পুনরুদ্ধারের কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে আওয়ামী লীগের সাবেক জ্যেষ্ঠ নেতা এবং বর্তমানে শেখ হাসিনার সমালোচক মাহমুদুর রহমান মান্না এই ঘোষণাকে আত্মকেন্দ্রিক বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের মধ্যে কিছু গ্রহণযোগ্য নেতা রয়েছেন, যাঁদের সামনে এনে দল পুনর্গঠনের সুযোগ শেখ হাসিনা দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তাই শুধু দলের স্বার্থে তাঁর ফিরে আসার দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন মান্না।
ফেরার ঘোষণা কি রাজনৈতিক চাপের কৌশল?
বিশ্লেষক জালাল উদ্দিন শিকদারের মতে, দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে শেখ হাসিনা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে চাইতে পারেন। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি এবং সেই নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দল বড় জয় পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
শিকদার সতর্ক করে বলেন, শেখ হাসিনা সরাসরি ভারত থেকে এসে কারাগারে গেলেও বাংলাদেশ সরকার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। তাঁর প্রত্যাবর্তন দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে এবং সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক নেতাদের কারাবরণের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে তারেক রহমানের মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় কয়েক বছর কারাগারে ছিলেন। বিএনপি বরাবরই ওই মামলাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছিল।
‘আমরা তাঁকে ফিরিয়ে আনতে চাই’
তবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, সরকার শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে ভয় পাচ্ছে না। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সরকার তাঁকে ফেরত চেয়ে ভারতকে চিঠি দিয়েছে এবং তিনি নিজেও যদি ফিরতে চান, তাহলে বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে।
তাঁর ভাষায়, শেখ হাসিনা ফিরে এলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
প্রতিবেদন অনুসারে, শেখ হাসিনা ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিচারপ্রক্রিয়ায় উপস্থিত হননি। আদালত তাঁকে উসকানি দেওয়া, হত্যার নির্দেশ এবং নৃশংসতা প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছে।
ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে নতুন সমীকরণ
শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশ ও ভারত দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন কাটিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। ঢাকা বারবার তাঁকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। অন্যদিকে, নয়াদিল্লি বলেছে, বাংলাদেশের আবেদনটি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি হয়েছে এবং ভারত তাঁকে সেপ্টেম্বরে একটি ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এখনো ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের বিষয় হয়ে রয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শেখ হাসিনার ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ শীর্ষক অনুষ্ঠান থেকে ভারত সরকারকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, এই আয়োজনে ভারত সরকারের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই এবং সেখানে প্রকাশিত কোনো মতামতকেও সরকার সমর্থন করে না।
তবে বাংলাদেশের কেউ কেউ মনে করছেন, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের হুমকিকে ভারত ঢাকার ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এএফপিকে বলেন, তিনি বিষয়টিকে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার ক্ষমতার লড়াইয়ের অংশ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ভারত সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে ‘হাসিনা কার্ড’ ব্যবহার করছে।
শেখ হাসিনা বাস্তবে দেশে ফিরবেন কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে তাঁর প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা ইতিমধ্যেই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সক্ষমতা, বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া এবং ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সুত্রঃ Jakartaglobe
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au