এআই ডেটা সেন্টারে ২৫০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করবে ব্যাংক অব আমেরিকা
মেলবোর্ন, ১৩ আগস্ট: যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ডেটা সেন্টার ও ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণে ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে ২৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়নের ঘোষণা দিয়েছে ব্যাংক…
মেলবোর্ন, ১৩ আগষ্ট- চীনের অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিয়ে দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান উৎপাদন ও রপ্তানি শক্তিতে পরিণত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন। বুধবার চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টার দিকে বেইজিংয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঝু রংজির মৃত্যু হয়। তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম প্রধান রূপকার হিসেবে পরিচিতি পান।
মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুলনামূলকভাবে কঠোর ও স্পষ্টভাষী এই সংস্কারক ১৯৯০-এর দশকে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। একই সঙ্গে চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন তিনি। এসব পদক্ষেপ পরবর্তী সময়ে চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করে।
সাবেক চীনা নেতা দেং শিয়াওপিংয়ের ১৯৭৯ সালে শুরু করা অর্থনৈতিক সংস্কারকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ঝু রংজির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দক্ষ ও লাভজনক করতে গিয়ে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির রক্ষণশীল অংশ এবং রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বিরোধিতার মুখে পড়েন। তার সংস্কারের ফলে লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারালেও দীর্ঘমেয়াদে চীনের অর্থনৈতিক কাঠামো আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে।
চীনের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদানের পথ তৈরিতেও ঝু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৮০-এর দশক থেকে চলা দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে তিনি ওয়াশিংটনে যান। সে সময় তার বাজার উন্মুক্ত করার প্রস্তাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত আলোচনা এগিয়ে যায়। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে চীন আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেয়। এর ফলে দেশটির বৈশ্বিক বাণিজ্য ও রপ্তানি দ্রুত সম্প্রসারিত হয় এবং চীন ধীরে ধীরে বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
ঝুর সময়ের অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে চীনের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ওপরে ছিল। ২০০৭ সালে প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছায়। পরবর্তী সময়ে চীন জাপানকে পেছনে ফেলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়।
তবে ঝু রংজি সরাসরি অর্থনীতিকে পুরোপুরি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না। বরং রাষ্ট্রীয় মালিকানা বজায় রেখেই ব্যাংক, বিমান সংস্থা, তেল কোম্পানি ও অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক ও কার্যকর কর্পোরেশনে রূপান্তরের পক্ষে ছিলেন তিনি। রাষ্ট্রীয় শিল্প পুনর্গঠনের মাধ্যমে অর্থনীতিতে দক্ষতা বাড়ানোই ছিল তার অন্যতম লক্ষ্য।
১৯৯৮ সালে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আবাসন বিক্রির একটি কর্মসূচির মাধ্যমে চীনে ব্যক্তিগত আবাসন মালিকানার বড় পরিসরের সূচনা হয়। সাধারণ মানুষ দ্রুত এসব আবাসন কিনতে শুরু করে এবং পরবর্তী এক দশকের মধ্যে শহরাঞ্চলের অধিকাংশ আবাসন ব্যক্তিমালিকানায় চলে যায়।
অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও ঝু নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন। ১৯৯০-এর দশকে উপপ্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি মূল্য নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন এবং লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঋণ দেওয়া বন্ধ করেন। স্থানীয় কর্মকর্তাদের বিরোধিতা সত্ত্বেও এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন তিনি।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণেও ঝু জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। কর্মকর্তাদের ব্যর্থতার সমালোচনা করার পাশাপাশি সরকারের ভুলের দায় প্রকাশ্যে স্বীকার করতেন তিনি। এ কারণে তাকে চীনে ‘বস’ এবং ‘পাগলা ঝু’ নামে ডাকা হতো।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র পিপলস ডেইলি একবার তার একটি বহুল আলোচিত বক্তব্য তুলে ধরেছিল। ১৯৯৮ সালে ঝু বলেছিলেন, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য ৯৯টি এবং নিজের জন্য একটি কফিন প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
১৯৯৮ সালের ভয়াবহ গ্রীষ্মকালীন বন্যায় চীনে ৪ হাজার ১৫০ জনের মৃত্যু হয়। বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর ঝু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, কিছু বাঁধ ‘সিমের বীজের গুঁড়ার’ চেয়েও দুর্বল। তিন বছর পর দক্ষিণ চীনের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিস্ফোরণে অন্তত ৪২ জন নিহত হলে জাতীয় টেলিভিশনে সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের কাছে ক্ষমা চান তিনি।
ঝু রংজির রাজনৈতিক জীবন অবশ্য সবসময় মসৃণ ছিল না। ১৯২৮ সালের ২৩ অক্টোবর চীনের হুনান প্রদেশে জন্ম নেওয়া ঝু কর্মজীবনের শুরুতেই রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে বাধার মুখে পড়েন। অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করার সময় ১৯৫৭ সালে হাঙ্গেরি ও যুগোস্লাভিয়ার অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রশংসা করায় তাকে ‘ডানপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এতে প্রায় ২২ বছর তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার স্থবির হয়ে পড়ে।
১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সালের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তাকে প্রত্যন্ত গ্রামে পাঠিয়ে শারীরিক শ্রমে নিয়োজিত করা হয়। ১৯৭৯ সালে পুনর্বাসনের পর দ্রুত তার রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়। ১৯৮৭ সালে তিনি সাংহাইয়ের ডেপুটি পার্টি সেক্রেটারি এবং পরের বছর মেয়র হন।
১৯৮৯ সালে তিয়েনআনমেন আন্দোলনের সময় সাংহাইয়ের মেয়র হিসেবে ঝু তুলনামূলক সংযত অবস্থান নেন। বিক্ষোভকারীদের দমন না করে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করেন তিনি। অস্ট্রেলীয় কূটনীতিক শেলি ওয়ার্নারের ১৯৯১ সালের একটি বইয়ে বলা হয়, ঝু অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এমন পরিস্থিতি এড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন, যেখানে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারত।
এরপর তার রাজনৈতিক উত্থান আরও দ্রুত হয়। ১৯৯১ সালে তিনি উপপ্রধানমন্ত্রী হন এবং ১৯৯৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নীতিনির্ধারণী স্থায়ী কমিটিতে যোগ দেন। ১৯৯৮ সালে ৬৯ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ঝু তার স্পষ্টভাষী বক্তব্য ও রসবোধের জন্যও পরিচিত ছিলেন। ১৯৯৯ সালের এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের একটি ছবি দেখিয়ে তিনি মজা করে বলেন, ছবিতে তাকে মৃত মানুষের মতো দেখাচ্ছে। তার এমন মন্তব্যে উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে হাসির সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় সরকারের রাজস্বের বড় অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিলে নেওয়ার মতো একটি নতুন করব্যবস্থা তৈরিতেও ঝুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৯৬ সালে তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন, এই কাজের জন্য তার অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত।
তবে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে জনসম্মুখ থেকে সরে যান। এরপর খুব কমই প্রকাশ্যে দেখা গেছে তাকে।
ঝু রংজির উত্তরাধিকার নিয়ে চীনে এখনও নানা মূল্যায়ন রয়েছে। তার সংস্কারের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারালেও রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে আরও দক্ষ করা, বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে চীনের সংযোগ বাড়ানো এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের প্রবেশ নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপ দেশটির পরবর্তী অর্থনৈতিক উত্থানের ভিত্তি তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে। এ কারণেই তাকে আধুনিক চীনের অর্থনৈতিক রূপকারদের অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সূত্র: এপি, এনবিসি নিউজ, সিনহুয়া।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au