অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ, চীনা নাগরিকসহ আটক ২
মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট: যশোরে ইসলামী ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এক চীনা নাগরিকসহ দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। বুধবার বিকেলে…
মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট- সরকার বদলেছে একাধিকবার। বামফ্রন্টের পর তৃণমূল কংগ্রেস, এরপর বিজেপির শাসন। কিন্তু কলকাতায় বড় অগ্নিকাণ্ডের চিত্র খুব একটা বদলায়নি। গত দুই দশকে শহরটিতে একের পর এক ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পরই উঠেছে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন, হয়েছে তদন্ত, দেওয়া হয়েছে নানা নির্দেশনা। কিন্তু কয়েক বছর পর আবারও ঘটেছে একই ধরনের দুর্ঘটনা।
নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে মঙ্গলবার রাতে আগুন লাগার পর পুরোনো এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আবার আলোচনায় এসেছে। হোটেল, হাসপাতাল, কারখানা, বাজার ও সরকারি ভবন, বিভিন্ন ধরনের স্থাপনায় আগুন লেগে প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ।
২০০৬ সালের ২২ নভেম্বর কলকাতার তপসিয়া এলাকায় একটি চামড়ার কারখানায় ভয়াবহ আগুন লাগে। তখন কারখানাটিতে প্রায় ৪০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। আগুন লাগার পর শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারখানা থেকে বের হওয়ার জন্য একটি মাত্র দরজা ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। আগুন লাগার পর দরজার চাবি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে দরজার তালা ভেঙে শ্রমিকেরা বের হওয়ার চেষ্টা করেন। ওই ঘটনায় নয়জনের মৃত্যু হয় এবং ১৮ জন আহত হন। কয়েকজন শ্রমিক শরীরের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে যান।
এর কয়েক বছর পর ২০১০ সালের ২৩ মার্চ কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের স্টিফেন কোর্ট ভবনে ভয়াবহ আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভবনের বিভিন্ন অংশে। অনেকে আগুন থেকে বাঁচতে বাইরে বের হতে পারলেও অনেকেই ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। কেউ কেউ প্রাণ বাঁচাতে ভবন থেকে নিচে ঝাঁপ দেন। ভবনের বন্ধ সিঁড়িতে আটকে পড়ে ধোঁয়া ও আগুনে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন কয়েকশ মানুষ।
২০১১ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতার ঢাকুরিয়ায় আমরি হাসপাতালে আগুন লাগে। হাসপাতালের বেসমেন্টে থাকা দাহ্য পদার্থ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে তদন্তে উঠে আসে। দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি হাসপাতালের ভেতরে ঘন বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। রোগী, চিকিৎসক, নার্স ও অন্য কর্মীরা বের হওয়ার চেষ্টা করলেও গুরুতর অসুস্থ ও আইসিইউতে থাকা অনেক রোগী বের হতে পারেননি। ঘুমন্ত অবস্থায় অনেক রোগীর মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় ৯৩ জন প্রাণ হারান।
২০১৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শিয়ালদহের সূর্য সেন স্ট্রিটের একটি কাগজ ও প্লাস্টিকের বাজারে আগুন লাগে। ভোরের দিকে আগুন লাগার সময় বাজারের ভেতরে অনেক শ্রমিক ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলেও অনেকেই আটকা পড়েন। ওই ঘটনায় ২০ জনের মৃত্যু হয়।
২০২১ সালের ৯ মার্চ সন্ধ্যায় স্ট্র্যান্ড রোডে পূর্ব রেলের নিউ কয়লাঘাট ভবনে আগুন লাগে। আগুন নেভাতে গিয়ে দমকলকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও বিপদের মুখে পড়েন। ওই ঘটনায় অন্তত নয়জনের মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে রেলের একজন কর্মকর্তা, দমকলের চার কর্মী, পুলিশের একজন কর্মকর্তা এবং রেল সুরক্ষা বাহিনীর একজন সদস্য ছিলেন। কয়েকজনের মৃত্যু হয় ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে।
২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল মেছুয়াবাজারের একটি হোটেলে ভয়াবহ আগুন লাগে। ওই ঘটনায় দুই শিশুসহ ১৪ জনের মৃত্যু হয় এবং ১৩ জন আহত হন। ঘটনার পর ওই এলাকার হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। কলকাতা পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং হোটেলগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।
এরপর ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি সাধারণতন্ত্র দিবসের ভোরে কলকাতার পূর্ব প্রান্তের আনন্দপুরের নাজিরাবাদ এলাকায় একটি মোমো কারখানার গুদামে আগুন লাগে। দ্রুত আগুন পাশের গুদামেও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শ্রমিকেরা ছিলেন। কয়েকজন বের হতে পারলেও অনেকে আগুনে আটকা পড়ে মারা যান।
প্রায় ৭২ ঘণ্টা ধরে তল্লাশি চালানোর পর উদ্ধার করা হয় বেশ কয়েকটি দেহ ও দেহাংশ। প্রাথমিকভাবে ১৮ জনের দেহাংশ শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে ওই ঘটনায় মোট ২৭ জনের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ দায়ের হয়েছিল। ফলে ওই অগ্নিকাণ্ডে মোট মৃতের সংখ্যা নিয়ে তখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সবশেষ বুধবার, ১৯ আগস্ট গভীর রাতে নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে আগুন লাগে। আগুনের পর কলকাতা শহরসহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় হোটেল ও অতিথিশালাগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ওই হোটেলে যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে রাজ্যের দমকলমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী আগের সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকারের সময়ে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে যে অবহেলা হয়েছে, তার প্রভাব এখনো বহন করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও গাফিলতির অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
কলকাতায় বড় অগ্নিকাণ্ডের পর প্রায় প্রতিবারই অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, অবৈধ নির্মাণ বন্ধ, জরুরি বের হওয়ার পথ খোলা রাখা এবং ভবনগুলোর নিয়মিত পরিদর্শনের মতো নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবারও কোনো না কোনো ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি সামনে এসেছে।
গত দুই দশকের এসব ঘটনায় একটি বিষয় বারবার স্পষ্ট হয়েছে। আগুন লাগার পর উদ্ধারকাজ চালানোর পাশাপাশি আগুন ঠেকানোর প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভবনে পর্যাপ্ত বের হওয়ার পথ, কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি সিঁড়ি ও প্রশিক্ষিত কর্মী না থাকলে ছোট আগুনও বড় প্রাণহানিতে পরিণত হতে পারে।
তাই সর্বশেষ নিউ মার্কেটের হোটেলে আগুনের পরও কলকাতার সামনে বড় প্রশ্ন, তদন্ত ও নির্দেশনার বাইরে গিয়ে এবার কি সত্যিই অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় স্থায়ী পরিবর্তন আসবে?
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au