হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১৫
মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট: হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব ও অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১৫ জন…
মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট: সরকারের প্রথম ছয় মাসের মধ্যে তিন মাস পার হয়েছে জ্বালানিসংকট মোকাবিলায়। সরকার গঠনের মাত্র ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় মার্চ-এপ্রিল দুই মাস কেটেছে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে। আর এখন প্রায় এক মাস ধরে চলছে গ্যাস–সংকট। সঙ্গে যোগ হয়েছে তীব্র লোডশেডিং। পরিস্থিতি সামলাতে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নের গতি ধীর।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এটা ঠিক, জ্বালানিসংকটের দায় বর্তমান সরকারের নয়। দেড় দশক ধরে সংকট বেড়েই চলেছে। আর দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছে। এর সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে এলএনজি টার্মিনাল দুর্ঘটনা। তবে সংকট মোকাবিলায় সরকারের ব্যবস্থাপনায়ও ঘাটতি দেখা গেছে। দ্রুত উত্তরণে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
গত মার্চে জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। মার্চের প্রথম চার দিনে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ হারে তেল বিক্রি হয়। এটি নিয়ন্ত্রণে সরকার রেশনিং চালু করলে আরও আতঙ্কিত হয় মানুষ। ফিলিং স্টেশনে ভিড় বাড়তে থাকে। কিছুদিন পর রেশনিং প্রত্যাহার করা হলেও সরবরাহ বাড়ানো হয়নি। সরকারের একটার পর একটা সিদ্ধান্ত উল্টো ফল দিতে থাকে। টানা প্রায় দুই মাস দিন-রাত ভিড় ছিল ফিলিং স্টেশনে। এপ্রিলের শেষ দিকে রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি, ফুয়েল পাস চালু ও বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর পর ভিড় কমে আসে।
এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশে জ্বালানি তেলের মজুত বাড়ানোর কথা বলা হলেও তা হয়নি। এখনো নিয়মিত আমদানির ওপর ভরসা করেই চলছে জ্বালানি তেল খাত। এর মধ্যে দরপত্র ছাড়া সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে একের পর এক তেল কেনার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও প্রথম দফায় তারা কেউ তেল সরবরাহ করেনি। এখন দ্বিতীয় দফায় আবার কয়েকটি কোম্পানিকে একই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অথচ কোনো কারণে আমদানি ব্যাহত হলেই দেখা দেবে সংকট।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এটা ঠিক, জ্বালানিসংকটের দায় বর্তমান সরকারের নয়। দেড় দশক ধরে সংকট বেড়েই চলেছে। আর দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছে।
দেশে জ্বালানি তেলের একমাত্র সরকারি পরিশোধনাগারটি স্বাধীনতার আগের। গত আওয়ামী লীগ সরকার ৩০ লাখ টনের শোধনাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ২০১২ সালে। কিন্তু প্রকল্পটির কাজ শুরু করেনি। শেষ দিকে এটি এস আলম গ্রুপকে দেওয়া হয়েছিল। গত অন্তর্বর্তী সরকার সেটি বাতিল করে সরকারি খরচে বাস্তবায়নের প্রকল্প নেয়, যা গত ফেব্রুয়ারিতে অনুমোদন করে উপদেষ্টা পরিষদ। বর্তমান সরকার এটি অব্যাহত রাখলেও প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেয়নি। ফলে কোনো কাজ এগোয়নি।
গত আওয়ামী লীগ সরকার দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন করেছিল ২০১০ সালে। এটি দায়মুক্তি আইন নামে পরিচিতি পায়। এ আইনের অধীনে একের পর এক চুক্তি করা হয়েছিল দরপত্র ছাড়া। বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে জ্বালানি নিশ্চিত না করেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছিল। এসব কেন্দ্রের গড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ সক্ষমতা অলস বসিয়ে রেখে কেন্দ্রভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ) দিতে হচ্ছে। প্রতিবছর বিদ্যুৎ খাতে সরকারের লোকসান বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে লোকসানে বিপিসি। জ্বালানি তেলের দাম দেশে এখন সর্বোচ্চ। তবু লোকসান সামলাতে এক যুগ পর সরকারের কাছে ভর্তুকি চেয়েছে সংস্থাটি। এত দিন মুনাফায় ছিল তারা।
বিপুল দায় রেখে যায় আওয়ামী লীগ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বকেয়ার বিপুল দায় রেখে গেছে আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তারা গ্যাস খাতে ৭৫ কোটি ডলার (প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা) ও জ্বালানি তেল খাতে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের (প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা) বকেয়া রেখে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার ধাপে ধাপে এসব বকেয়া শোধ করে দেয়। বর্তমান সরকার বকেয়া বাড়ায়নি। তবে দুই খাতেই ভর্তুকি বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে লোকসানে বিপিসি। জ্বালানি তেলের দাম দেশে এখন সর্বোচ্চ। তবু লোকসান সামলাতে এক যুগ পর সরকারের কাছে ভর্তুকি চেয়েছে সংস্থাটি। এত দিন মুনাফায় ছিল তারা।
সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চুক্তি অনুসারে বিদ্যুৎ কিনে নেয় পিডিবি। নিয়মিত বিল শোধ না করায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বাড়তে থাকে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে আওয়ামী লীগ বকেয়া রেখে গেছে ৪৭ হাজার কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে বকেয়া বাড়তে থাকে। এরপর ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত আগের বকেয়াসহ নিয়মিত বিল দিয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এতে বকেয়া কমলেও গত বছরের আগস্ট থেকে বকেয়া আবার বাড়তে থাকে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় বকেয়া ছিল ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এখন বকেয়া প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
এসব কেন্দ্রের গড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ সক্ষমতা অলস বসিয়ে রেখে কেন্দ্রভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ) দিতে হচ্ছে। প্রতিবছর বিদ্যুৎ খাতে সরকারের লোকসান বাড়ছে।
বেসরকারি খাতে তেল বিক্রির উদ্যোগ
বেসরকারি খাতের মাধ্যমে জ্বালানি তেল বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে শুধু সরকারি কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তাদের ডিলারদের মাধ্যমে তেল বিক্রি করে। সম্প্রতি বেসরকারি খাতে তেল বিক্রির সুযোগ দিতে একটি নীতিমালা তৈরি করতে বলেছে জ্বালানি বিভাগ। এটি করা হলে পরিশোধিত জ্বালানি তেল (ডিজেল, পেট্রল, অকটেন) আমদানি করে নিজস্ব ডিলারদের মাধ্যমে বাজারে বিক্রি করতে পারবে বেসরকারি কোম্পানি। এর আগে অপরিশোধিত জ্বালানি এনে পরিশোধন করে বাজারে বিক্রির নীতিমালা করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। একটি কোম্পানিকে তারা শেষ সময়ে অনুমোদনও দিয়েছিল। তবে বেসরকারি খাতে তেল বিক্রির সুযোগ দিলে বাজার অস্থির হতে পারে।
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজার পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করে বেসরকারি খাত। তারা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করে। সরকারকে চাপে ফেলার ঘটনাও আছে। তাই জ্বালানি তেল বেসরকারি খাতে দেওয়ার বিরোধিতা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রথম আলোকে বলেন, ছয় মাসে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়ার দরকার ছিল, তা নেওয়া গেছে। সমুদ্রে তেল–গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ সক্ষমতার তেল শোধনাগার নির্মাণ ও ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে এ তিনটি বড় উদ্যোগ নেওয়া গেছে। জ্বালানিসংকট নিয়ে সারা পৃথিবীকে হিমশিম খেতে হয়েছে। সরকার সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুরু না হলে হয়তো আরও ভালো অবস্থানে থাকত সরকার।
এক দশকের ব্যবধানে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন কমেছে ১০০ কোটি ঘনফুট। ২০১৭ সালে দিনে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা হয়েছে দেশে। আর এখন উৎপাদন হচ্ছে ১৬৩ কোটি ঘনফুট। অথচ দিনে চাহিদা এখন ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ বিধান আইনটি রহিত করেছে। নতুন সরকারের আমলে ওই আইন না থাকলেও দরপত্র ছাড়া চুক্তি করার দিকে ঝোঁকটা বেশি দেখা গেছে। সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে ও কম দামে কিনতে চুক্তি করা হয়েছে দরপত্র ছাড়া। দরপত্র ছাড়া জ্বালানি তেল ও এলএনজি কেনার কাজ দিয়ে সময়মতো সরবরাহ পাওয়া যায়নি। এলএনজির কার্গো না আসায় গ্যাসের সংকট বেড়েছে। এর মধ্যে মার্কিন একটি বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গেও জিটুজি চুক্তি আছে। নতুন একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে চীনের কোম্পানির সঙ্গে জিটুজি করার প্রক্রিয়া চলছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের মতো কালাকানুন তো দূরে থাক, সরকার নতুন করে কোনো আইন করেনি। সরকারের বিদ্যমান ক্রয় বিধিমালা মেনেই চুক্তি ও কেনাকাটা করা হচ্ছে। বিশেষ পরিস্থিতি বলেই এটা করতে হয়েছে।
আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে পাইপলাইনে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল আছে—একটি সামিটের, অন্যটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের। এ দুটি মিলে এলএনজি সরবরাহের সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট।
গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, প্রতিবছর দেশীয় গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন কমছে গড়ে ১৫ কোটি ঘনফুটের বেশি। গত বছর থেকে এটি প্রতি সপ্তাহে বা প্রতিদিন যেন কমছে। এক দশকের ব্যবধানে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন কমেছে ১০০ কোটি ঘনফুট। ২০১৭ সালে দিনে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা হয়েছে দেশে। আর এখন উৎপাদন হচ্ছে ১৬৩ কোটি ঘনফুট। অথচ দিনে চাহিদা এখন ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
আওয়ামী লীগ সরকার একপর্যায়ে অনুসন্ধানে জোর না দিয়ে আমদানির দিকে ঝুঁকে যায়। ২০১৮ সালে শুরু হয় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি। আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে পাইপলাইনে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল আছে—একটি সামিটের, অন্যটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের। এ দুটি মিলে এলএনজি সরবরাহের সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট। এর বাইরে আরও দুটি ভাসমান ও স্থলভাগে টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল
আওয়ামী লীগ সরকার। বিশেষ আইনে একটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণে চুক্তি হয় সামিটের সঙ্গে এবং আরেকটির জন্য টার্ম শিট সই করা হয় এক্সিলারেটের সঙ্গে। অন্তর্বর্তী সরকার এসে সামিটের চুক্তিটি বাতিল করে দেয়। আর এক্সিলারেটের সঙ্গে চুক্তি না করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে গত দুই বছরে নতুন কোনো টার্মিনাল যুক্ত হয়নি। তাই চাইলেও আমদানি বাড়ানো যাচ্ছে না।
স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানেও জোর ছিল না। এরপর গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তেল–গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্রে কোনো কোম্পানি অংশ নেয়নি। নতুন করে গত মে মাসে দরপত্র আহ্বান করেছে বর্তমান সরকার। এবার চুক্তি করা গেলেও গ্যাস আবিষ্কারে অন্তত পাঁচ বছর লাগতে পারে।
এর মধ্যে গত ২১ জুলাই এক্সিলারেটের টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডের কারণে বন্ধ হলে গ্যাসের সংকট তীব্র হয়। ১৫ আগস্ট টার্মিনালটি গ্যাস সরবরাহের জন্য পুরোপুরি তৈরি হলেও এলএনজি না থাকায় আংশিক
সরবরাহ করে। এলএনজির অভাবে গতকাল বুধবার বিকেলে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন শুধু সামিটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে।
নতুন করে দুটি ভাসমান টার্মিনাল ও স্থলভাগে একটি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার। একটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনে চীনের একটি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার পথে। এটি জিটুজি ভিত্তিতে চুক্তি করা হবে। আর স্থলভাগে মাতারবাড়ীতে জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে এবং পরামর্শক নিয়োগ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
অনুসন্ধানের তুলনায় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে সফলতার হার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশি বাংলাদেশে। তবু যথাযথ অনুসন্ধান করা হয়নি দেশে। সমুদ্রসীমা বিজয়ের ১৪ বছর পরও বঙ্গোপসাগরে তেল–গ্যাস আবিষ্কার করা যায়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চারটি কোম্পানি কাজ শুরু করলেও শেষ না করে চলে গেছে। স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানেও জোর ছিল না। এরপর গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তেল–গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্রে কোনো কোম্পানি অংশ নেয়নি। নতুন করে গত মে মাসে দরপত্র আহ্বান করেছে বর্তমান সরকার। এবার চুক্তি করা গেলেও গ্যাস আবিষ্কারে অন্তত পাঁচ বছর লাগতে পারে।
ডলার–সংকটে ২০২২ সালে টানা সাত মাস খোলাবাজার থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ রাখে আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর ওই বছরের মাঝামাঝি অনুসন্ধান, সংস্কার ও উন্নয়ন মিলিয়ে ৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেয় সরকার। এটি করা গেলে জাতীয় গ্রিডে দিনে প্রায় ৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার কথা। এটিও অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার প্রথম ৫০ কূপের গতি বাড়ানোর দায়িত্ব নেয় এবং আরও ১০০ কূপের পরিকল্পনা করে। বিএনপি সরকার ১৫০ কূপের কাজে গতি বাড়ানোর কথা বলেছে শুরু থেকেই। তবে এখন পর্যন্ত সবমিলে শেষ হয়েছে মাত্র ৩০টির কাজ। ৮টির কাজ চলমান। অথচ ২০২৫ সালেই ৫০টি কূপের কাজ শেষ করার কথা ছিল। গত ছয় মাসেও গতি বাড়ানোর কার্যত তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি। ভোলার অব্যবহৃত গ্যাস কাজে লাগাতে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে পারেনি সরকার।
নতুন সরকার গঠনের পর জ্বালানি খাত নিয়ে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে জ্বালানি বিভাগ। এতে বলা হয়, এ বছর ১১৫ কার্গো আনার পরিকল্পনা আছে। অবকাঠামো সক্ষমতা না থাকায় চাইলেও এর চেয়ে বেশি আনার সুযোগ নেই। এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে ২০৩০ সালে গিয়ে চাহিদামতো গ্যাস সরবরাহ করা যাবে। এ ছাড়া আগামী সংসদ অধিবেশনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে ১০ বছরের পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে নতুন সরকার চুক্তি পর্যালোচনার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে একটি কমিটি করেছে, যারা কাজ করছে। এর মধ্যে গত জুনে পাইকারি পর্যায়ে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর
গত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার ও খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। এরপরও প্রতিবছর বেড়েছে সরকারের ভর্তুকি। পটপরিবর্তনের পর দাম না বাড়িয়ে খরচ কমাতে সব বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনায় ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর একটি কমিটি করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। গত ২০ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কমিটি। এতে চুক্তিতে বাড়তি খরচ চিহ্নিত করা হয়েছে। গত অর্থবছরেও বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ) ৪৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।
তবে নতুন সরকার চুক্তি পর্যালোচনার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে একটি কমিটি করেছে, যারা কাজ করছে। এর মধ্যে গত জুনে পাইকারি পর্যায়ে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম।
আওয়ামী লীগ আমলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বের কথা বলা হলেও কার্যত কিছুই করা হয়নি। তবে নতুন সরকার আন্তরিকভাবেই এ খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। চলতি বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ আমদানিতে আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং আগাম কর তুলে দিয়েছে সরকার। এতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কমতে পারে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। তবে এতে কিছু শর্ত বেঁধে দেওয়ায় সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা ব্যাহত হতে পারে বলে শঙ্কা আছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।
গত এপ্রিল ও চলতি মাসে দেশে নিয়মিত লোডশেডিং দেখা গেছে। বিশেষ করে এবার গ্যাস–সংকটের পর তীব্র লোডশেডিং দেখা যায় সারা দেশে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল বকেয়া থাকায় জ্বালানিসংকট প্রকট হয়ে ওঠে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। তাই ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদিত হচ্ছে বড়জোর ১৪ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। এতে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে।
গত এপ্রিল ও চলতি মাসে দেশে নিয়মিত লোডশেডিং দেখা গেছে। বিশেষ করে এবার গ্যাস–সংকটের পর তীব্র লোডশেডিং দেখা যায় সারা দেশে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল বকেয়া থাকায় জ্বালানিসংকট প্রকট হয়ে ওঠে।
ব্যয়বহুল ও ভঙ্গুর খাত
নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি বলেছে, গত দেড় দশকে সীমাহীন দুর্নীতি, অস্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, ব্যয়বহুল স্বল্পমেয়াদি চুক্তি, আত্মঘাতী ক্যাপাসিটি চার্জ এবং অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতার কারণে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ব্যয়বহুল, দুর্নীতিগ্রস্ত ও ভঙ্গুর কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। বিএনপির লক্ষ্য হলো জাতীয় উন্নয়নের চালিকা শক্তি হিসেবে দেশীয় সম্পদের স্বচ্ছ, দক্ষ ও সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ-জ্বালানিব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এতে আরও বলা হয়, ক্যাপাসিটি চার্জের রেন্টাল ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক ব্যয় হ্রাস এবং স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা ক্রমান্বয়ে চিহ্নিত করে দেশীয় উৎস ও আমদানির মধ্যে ভারসাম্য আনা হবে। চট্টগ্রাম বা উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলে ধাপে ধাপে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টন পরিশোধন সক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ক্রুড অয়েল রিফাইনারি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও কূপ খননে বাপেক্সকে শক্তিশালী করে স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা হবে এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছ, প্রযুক্তিগত কাঠামো নিশ্চিত করা হবে। জ্বালানির দাম সাশ্রয়ী ও স্বচ্ছ রাখতে ট্যারিফ নির্ধারণব্যবস্থার কার্যকারিতা জোরদার করা হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাধীন পর্যালোচনা প্রক্রিয়া চালু করা হবে। নবায়নযোগ্য শক্তি ও শক্তি দক্ষতায় কর রেয়াত এবং স্বল্পমূল্যের সুদের অর্থায়ন সুবিধা দেওয়া হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বেসরকারীকরণ কোনো কার্যকর ফল দেবে না; বরং বাজারে দাম বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের আর্থিক বোঝা বাড়াতে পারে।
সিপিডি গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ বলছে, বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যে। বিদ্যুৎ বিভাগ ইতিমধ্যে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০) তৈরি করেছে। বাজেটে শুল্ক রেয়াত সুবিধা দেওয়া হয়েছে। নতুন টার্মিনাল স্থাপনের কাজ এগিয়েছে। তেল শোধনাগার নির্মাণ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে জোর দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমাতে চুক্তি পর্যালোচনায় কমিটি কাজ করছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানি খাতের সমস্যা পুঞ্জীভূত ও আগের সরকারের রেখে যাওয়া। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও জটিল করেছে পরিস্থিতি। সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, আমলাদের ওপর নির্ভরতা ও সংকট মোকাবিলায় ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি দেখা গেছে। দ্রুত সিদ্ধান্তে পারঙ্গমতা দেখাতে পারেনি। তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে আরও দক্ষতার দরকার ছিল। আমদানিনির্ভরতা থেকে বের হয়ে দীর্ঘ মেয়াদে সমাধানের পদক্ষেপ দেখা গেছে। এতে ফল আসতে সময় লাগে। দু–একটি বিষয়ে আন্তরিকতা থাকলেও সামগ্রিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সরকারের আরও প্রস্তুতি থাকা দরকার ছিল।
তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বেসরকারীকরণ কোনো কার্যকর ফল দেবে না; বরং বাজারে দাম বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের আর্থিক বোঝা বাড়াতে পারে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au