বিশ্ব

জাতিসংঘের প্রতিবেদন

মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি, শিশুকে দিয়ে সরানো হয় নিহতদের হাড়গোড়

  • 6:18 am - August 26, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২০০ বার
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর)। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৬ আগষ্ট- মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনী ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাতের মধ্যে বেসামরিক মানুষের ওপর হত্যা, নির্যাতন, জোরপূর্বক শ্রম, বাস্তুচ্যুতি ও যৌন সহিংসতার মতো ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এমনকি গণহত্যায় নিহত ব্যক্তিদের হাড় ও খুলি পরিষ্কার করতে শিশুকে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটেছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) নতুন এক প্রতিবেদনে মিয়ানমারের এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। মঙ্গলবার ওএইচসিএইচআরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবেদনটির বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনটি ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তৈরি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশটির চলমান সংঘাত, সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং সংঘাতকে ঘিরে গড়ে ওঠা অবৈধ অর্থনীতি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ওএইচসিএইচআর বলছে, বেসামরিক মানুষের ওপর বিমান হামলা, অগ্নিসংযোগ, জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারও সামরিক বাহিনীর দমনমূলক কর্মকাণ্ডকে আরও সহজ করেছে।

রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত

২০১৭ সালের ভয়াবহ সহিংসতার প্রায় নয় বছর পরও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সহিংসতার পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

উত্তর রাখাইনে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, গুম, জোরপূর্বক শ্রম ও নিয়োগ এবং ভূমি ও আবাসিক সম্পত্তি বেআইনিভাবে দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের গ্রাম, ধর্মীয় স্থাপনা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ধ্বংসের ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে নতুন করে বহু রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

শিশুকে দিয়ে হাড়গোড় পরিষ্কার

প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যগুলোর একটি হলো, মিয়ানমারে শিশুদেরও পরিকল্পিতভাবে শ্রমে ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে ওএইচসিএইচআর জানিয়েছে, ছয় বছরের কম বয়সী শিশুকেও জঙ্গল পরিষ্কার, ভবন নির্মাণ এবং রাখাইন পরিবারগুলোর বিভিন্ন গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

একটি ঘটনায় এক শিশুকে গণহত্যায় নিহত ব্যক্তিদের হাড় ও খুলি পরিষ্কার করতে বাধ্য করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জোরপূর্বক নিয়োগ এড়াতে বাল্যবিবাহ

রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ধরনের নিয়োগ এড়ানোর চেষ্টা করায় রোহিঙ্গাদের গ্রেপ্তার ও আটক করা হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে কিছু রোহিঙ্গা পরিবার মনে করছে, বিবাহিত নারীদের জোরপূর্বক নিয়োগের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। এ কারণে অনেক রোহিঙ্গা মেয়ে বাল্যবিবাহের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আটকের পর নির্যাতনের ভয়াবহ বিবরণও দিয়েছেন মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিরা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাঁশের লাঠি, রাবারের পাইপ ও বেল্ট দিয়ে পেটানো, দেশলাই ও সিগারেট দিয়ে শরীর পুড়িয়ে দেওয়া, পা ওপরে তুলে ঝুলিয়ে রাখা, যৌনাঙ্গে মরিচ দেওয়া এবং নখ উপড়ে ফেলার মতো নির্যাতন চালানো হয়েছে।

সংঘাতের অর্থ জোগাচ্ছে অবৈধ খনি ও মাদক ব্যবসা

মিয়ানমারের মানবাধিকার সংকটের সঙ্গে দেশটির অবৈধ অর্থনীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

আইনের শাসনের দুর্বলতার সুযোগে খনিজ সম্পদের অবৈধ উত্তোলন, মাদক উৎপাদন, মানব পাচার এবং অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রের বিস্তার ঘটছে। এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে পাওয়া অর্থ দেশটির চলমান সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।

অর্থনৈতিক সংকট ও সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ায় একটি শোষণমূলক শ্রমবাজারও তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাভোগী ও অপরাধী গোষ্ঠীগুলো এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষকে কাজে লাগাচ্ছে।

প্রাকৃতিক সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বিশেষ করে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকাগুলোর পরিবেশ, জীবিকা ও ঐতিহ্যবাহী সামাজিক কাঠামোর ওপরও ব্যাপক ক্ষতি করছে।

কাচিন ও শানে বেড়েছে খনি

প্রতিবেদনে কাচিন ও শান রাজ্যের খনি খাতের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কাচিনে ২০২১ সালের পর নতুন করে ৩০২টি খনি এলাকা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের তুলনায় এসব খনি এলাকার সংখ্যা ১৪৯ শতাংশ বেড়েছে।

শান রাজ্যেও সামরিক অভ্যুত্থানের আগে যেখানে ১২টি খনি এলাকা ছিল, পরবর্তী সময়ে তা বেড়ে ৮৫টিতে দাঁড়িয়েছে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কর্মকাণ্ড আন্তসীমান্ত অপরাধী নেটওয়ার্কের বিস্তার, পরিবেশদূষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর শোষণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৩ সালে এসব খাতের বাণিজ্যপ্রবাহ ১৪০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

খনিশিল্পে নারীদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। তবে এর ফলে নারী শ্রমিকদের যৌন সহিংসতা ও হয়রানির ঝুঁকি আরও বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খনি এলাকায় নিয়োজিত নিরাপত্তারক্ষী, তত্ত্বাবধায়ক ও মিলিশিয়া সদস্যদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ রয়েছে।

আত্মপর্যালোচনার আহ্বান জাতিসংঘের

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক মিয়ানমারের পরিস্থিতিকে গভীরভাবে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি রাষ্ট্র, কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের নিজেদের কর্মকাণ্ড ও নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে আত্মপর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর প্রশ্ন, মিয়ানমারের জনগণের জন্য এসব কর্মকাণ্ড আদৌ ন্যায্য ও ন্যায়সংগত কি না এবং এর ফলে যে সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে, তা আদৌ পূরণ করা সম্ভব কি না।

জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের কারণে বেসামরিক মানুষের ওপর বহুমাত্রিক নির্যাতন, শোষণ ও মানবিক সংকটের যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এই শাখার আরও খবর

অস্ট্রেলিয়ায় বন্যার পানিতে ডুবতে থাকা গাড়ি থেকে চালককে বাঁচালেন সাংবাদিক

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড অঙ্গরাজ্যে বন্যার পানিতে ডুবে যেতে থাকা একটি গাড়ি থেকে চালককে উদ্ধার করেছেন টেলিভিশন সাংবাদিক উইল মারে ও এক পথচারী। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ঘটে…

গোলাগুলি ও অবরোধে অচল সাজেক, পর্যটন ব্যবসায় ২০ কোটি টাকা ক্ষতির শঙ্কা

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালিতে আঞ্চলিক সংগঠনের অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গোলাগুলি ও সংঘর্ষের পর থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আতঙ্কে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে বাড়িঘর ও…

নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পিছিয়ে গেল পিএসজির ম্যাচ

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে চলমান বিক্ষোভ ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি) ও লিওঁর মধ্যকার ফুটবল ম্যাচ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ আয়োজনের অনুমতি…

দেশে দেশে কেন বিদ্রোহ করছে জেন-জি

বাংলাদেশ ও নেপালের পর ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে। এসব আন্দোলন ‘জেন-জি বিক্ষোভ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য…

ফের বিক্ষোভের আশঙ্কায় ফ্রান্সে নিরাপত্তা জোরদার

ফ্রান্সে আবারও বিক্ষোভ ও সহিংসতার আশঙ্কায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করছে দেশটির সরকার। গত শনিবারের সহিংসতা ও লুটপাটের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, বিভিন্ন শহরে সমাবেশে বিধিনিষেধ…

তাইওয়ান ঘিরে চীনের নৌ তৎপরতা বৃদ্ধি, উদ্বেগে জাপান-ফিলিপাইন

তাইওয়ানকে ঘিরে এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নৌ তৎপরতা বাড়াতে চীন সামুদ্রিক মিলিশিয়ার নৌযানের পাশাপাশি কোস্টগার্ডের জাহাজ ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেছে তাইওয়ানের কোস্টগার্ড। তাদের…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au