চীনের জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কিনতে এগোচ্ছে বাংলাদেশ
মেলবোর্ন, ২৬ আগষ্ট- বাংলাদেশ বিমানবাহিনী আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চীনের তৈরি জে-১০সিই বহুমুখী যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করছে। এ জন্য বহুমুখী যুদ্ধবিমান ও অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার একটি…
মেলবোর্ন, ২৬ আগষ্ট- মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ব্যাপকভাবে বিতাড়নের প্রায় নয় বছর পর আবারও তাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমার কিছুটা অগ্রগতির কথা জানালেও রাখাইন রাজ্যে চলমান গৃহযুদ্ধ, সহিংসতা, নাগরিকত্বের সংকট এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে বড় পরিসরে নিরাপদ প্রত্যাবাসন এখনো সম্ভব হচ্ছে না।
চলতি মাসের শুরুতে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডো জানায়, বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের জন্য যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছে ৮ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গার নামের তালিকা পাঠিয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৮ হাজার জনকে মিয়ানমার সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করেছে। তবে রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে মিয়ানমার।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৭ সালের পর যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বড় পরিসরে নিরাপদ ও টেকসই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। মিয়ানমারে এখনো গৃহযুদ্ধ চলছে এবং রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ দেশটির সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের অধিকারও নিশ্চিত করা হয়নি।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা এআরএসএ কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা চালানোর পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে।
সেই অভিযানের পর ৭ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে সামরিক অভিযানের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে। তাদের বেশির ভাগই কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছেন।
বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের দেশটির ১৩৫টি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর একটি হিসেবে স্বীকার করে না। বরং দীর্ঘদিন ধরে তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করা হয় এবং বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসী হিসেবে দাবি করা হয়। যদিও বহু প্রজন্ম ধরে রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যে বসবাস করে আসছেন।
জাতিসংঘের তদন্তকারীরা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ডে গণহত্যার অভিপ্রায়ের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রও জানায়, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।
রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যে মামলা করেছে, সেটিও এখনো নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে বিচারাধীন।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সংঘাতের বড় প্রভাব পড়েছে রাখাইন রাজ্যেও। সেখানে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এখন আর অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারছে না।
লন্ডনফেরো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং ‘মিয়ানমার’স রোহিঙ্গা জেনোসাইড’ বইয়ের লেখক রোনান লি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে এবং দেশটির অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দিলে তারা আবারও সহিংসতার শিকার হতে পারেন।
রোনান লি বলেন, মিয়ানমারের বর্তমান সরকার একই সামরিক বাহিনীর প্রভাবাধীন, যে বাহিনী ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের জোর করে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিল। তাই তার মতে, ২০১৭ সালের তুলনায় এখন মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জীবন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস-ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের মিয়ানমার স্টাডিজ প্রোগ্রামের প্রধান মো থুজারও মনে করেন, ২০১৭ সালের পর যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন করা বেশি কঠিন।
রাখাইনভিত্তিক জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি বর্তমানে রাজ্যটির বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এই সংগঠনটি রোহিঙ্গা বিদ্রোহী সংগঠন এআরএসএ থেকে আলাদা। রোহিঙ্গারা ২০১৭ সালে যেসব উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা থেকে পালিয়ে এসেছিলেন, সেসব এলাকারও বড় অংশ এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি উভয়ের বিরুদ্ধেই রোহিঙ্গাদের ওপর গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগ উঠে এসেছে। এর মধ্যে চলাচলে বিধিনিষেধ, নির্বিচারে আটক এবং জোরপূর্বক নিয়োগের মতো ঘটনাও রয়েছে।
জার্মানির বিয়েলেফেল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান্টজে মিসবাখ বলেন, স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কোনো চুক্তি হলেও মিয়ানমার সরকার এখনো রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয়নি। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের বহু গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে এবং কিছু এলাকায় এখন অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করছেন।
তার মতে, রাখাইন রাজ্য এখনো রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ নয়। গত দুই বছরে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া যখন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে, তখন বাংলাদেশে অনির্দিষ্টকাল অবস্থান করাও রোহিঙ্গাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। শরণার্থী শিবিরগুলোতে অর্থের সংকট, নিরাপত্তাহীনতা, কাজের সুযোগের অভাব এবং শিক্ষার সীমিত সুযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘাত অধ্যয়নের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর অবনতিশীল পরিস্থিতি শরণার্থীদের আচরণেও পরিবর্তন আনছে। গণহত্যার মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আসা এই জনগোষ্ঠী এখন বেঁচে থাকার জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
তার মতে, প্রায় ১০ লাখ শরণার্থী থাকা শিবিরগুলোতে অতিরিক্ত জনসংখ্যা, দীর্ঘদিনের অর্থসংকট, খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়া, শিক্ষা ও জীবিকার সীমিত সুযোগ এবং বাড়তে থাকা নিরাপত্তা সংকট একসঙ্গে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের মধ্যে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশে যাওয়ার জন্য বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার প্রবণতাও বেড়েছে। একই সঙ্গে শিবিরগুলোতে গ্যাং সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাড়ছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম।
খাদ্যসংকটের কারণে শিশুবিয়ে, শিশুশ্রম এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার প্রবণতাও বাড়ছে। অনেক পরিবারকে সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের পরিবর্তে তাৎক্ষণিকভাবে খাবার ও বেঁচে থাকার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বা ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এখন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, গত বছর তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত রোহিঙ্গা শিশুদের চিকিৎসা গ্রহণের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে।
ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী মিজানুর রহমান বলেন, এত বড় একটি বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি বোঝা বহন করা নিয়ে বাংলাদেশের যৌক্তিক উদ্বেগ রয়েছে। তাই সমাধান হিসেবে শুধু বাংলাদেশকে আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলা যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রকৃত দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন।
জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ জানিয়েছে, ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১০ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থায়ন হয়েছে।
এ বছর বাংলাদেশকে মানবিক সহায়তা হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করেছে। এর বেশির ভাগ অর্থ রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ব্যয় হওয়ার কথা। এ ছাড়া জুন মাসে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে আরও ১৪ মিলিয়ন ইউরো দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা স্থায়ীভাবে নতুন জীবন গড়ে তুলতে পারছেন না। অন্যদিকে মিয়ানমারেও নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। ফলে ২০১৭ সালের পর প্রায় নয় বছর পেরিয়ে গেলেও রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au