বাংলাদেশ

রংপুরে চার খুন

পুলিশের তদন্ত নিয়ে ১৯ প্রশ্ন, আসামিদের পক্ষে না দাঁড়ানোর ঘোষণা আইনজীবীদের

  • 11:26 pm - August 29, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৫৬ বার
পুলিশের দাবি ডাকাতি, স্বজনরা বলছেন বাড়ি করার সময় চাঁদা চেয়েছিল।ছবিঃ সংগৃহীত

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের তদন্ত ও গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি। সংগঠনটি এ ঘটনায় ১৯টি প্রশ্ন তুলে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে। একই সময়ে হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা বিবেচনায় মামলায় গ্রেপ্তার আসামিদের পক্ষে আপাতত আদালতে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে রংপুর আইনজীবী সমিতি।

শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে রংপুর নগরের জাহাজ কোম্পানি এলাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে নাগরিক কমিটি। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনটির সদস্যসচিব পলাশ কান্তি নাগ।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় রংপুরসহ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক চিত্র ফুটে উঠেছে। হত্যাকাণ্ডের পর দুইজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ যে বক্তব্য দিয়েছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন, সংশয় ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করে নাগরিক কমিটি।

সংগঠনটির অভিযোগ, পুলিশের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে নিহতদের স্বজনদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং পুলিশ ও ফরেনসিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যের মধ্যে বেশ কিছু অসংগতি রয়েছে। এসব অসংগতি দূর না করে শুধু আসামিদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হলে প্রকৃত ঘটনা আড়ালে থেকে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন তোলা হয়, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার মতো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে একটি পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করার ঘটনা কতটা স্বাভাবিক। পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, চারজনকে হত্যার পরও আসামিরা দীর্ঘ সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করে গোসল ও খাবার খেয়েছেন। এমন পরিস্থিতি বাস্তবসম্মত কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে দাবি করা হয়।

ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরা ও গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির বিদ্যুৎ-সংযোগের তার কে বা কারা কেটেছে, হত্যার আগে ও পরে অচেনা মোটরসাইকেলে কারা সেখানে যাতায়াত করেছে এবং কেউ বাড়িটি আগে থেকে নজরদারি করছিল কি না, এসব বিষয় যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে নাগরিক কমিটি।

লুট হওয়া টাকা ও স্বর্ণালংকারের হিসাব নিয়েও পুলিশের বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে বলে দাবি সংগঠনটির। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী লুট হওয়া টাকার পরিমাণ এবং গ্রেপ্তার আসামিদের কাছ থেকে উদ্ধার বা তাঁদের ভাগে পাওয়া অর্থের হিসাবের মধ্যে মিল আছে কি না, তা স্পষ্ট করার দাবি জানানো হয়েছে। একইভাবে ঘটনাস্থলে পাওয়া ইয়াবার সংখ্যার হিসাব কেন পরিবর্তিত হয়েছে, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করার দাবি জানানো হয়।

রংপুর নগরের জাহাজ কোম্পানি এলাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে নাগরিক কমিটি। ছবিঃ সংগৃহীত

এর পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের আগে পরিবারের সদস্যদের কোনো ধরনের আশঙ্কা বা অভিযোগ ছিল কি না, বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে তাঁদের কাউকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল কি না এবং এসব বিষয় পুলিশ তদন্তে যাচাই করেছে কি না, তা জানতে চেয়েছে নাগরিক কমিটি।

পলাশ কান্তি নাগ বলেন, শুধু আসামিদের স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর করে তদন্ত শেষ করা উচিত নয়। সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক আলামত, মুঠোফোনের তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যসহ সব তথ্যের সঙ্গে পুলিশের বর্ণনা মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। তদন্তে যেসব অসংগতি রয়েছে, সেগুলো দূর করে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলন থেকে গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজন হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্ত, প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে দেশে সংঘটিত অন্যান্য হত্যাকাণ্ডেরও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়।

এদিকে, একই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামিদের পক্ষে আপাতত আদালতে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে রংপুর আইনজীবী সমিতি। ভবিষ্যতে এ ঘটনায় আরও কেউ গ্রেপ্তার হলেও তাঁর পক্ষে আইনজীবী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সমিতি। তবে তদন্তের গতিপথ বা ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা পরিবর্তিত হলে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।

শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রংপুর আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এতে সমিতির সভাপতি শাহেদ কামাল ইবনে খতিব ও সাধারণ সম্পাদক আফতাব উদ্দিন বক্তব্য দেন। এ সময় রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী উপস্থিত ছিলেন।

আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আফতাব উদ্দিন বলেন, চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে তাঁদের ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়টি বোঝা যাচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের পক্ষে আদালতে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এ সিদ্ধান্ত আমরা আপাতত নিয়েছি। অনেকেই মনে করেন, আইনজীবীরা টাকার বিনিময়ে অন্যায়কে সমর্থন করেন। এটি মোটেই ঠিক নয়। চার খুনের ঘটনায় আসামিদের পক্ষে আদালতে না দাঁড়ানোই তার বড় প্রমাণ। আমরা চাই, নিহত গণপতি চক্রবর্তীর স্বজনেরা সঠিক বিচার পান।’

এর আগে শনিবার রাতে রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রংপুর মহানগর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন।

পরে মামলায় একই এলাকার কানু দাসের ছেলে মুগ্ধ দাস ও বিনয় দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার দুজন আদালতে স্বেচ্ছায় হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, ঘটনার সময়, আসামিদের ভূমিকা এবং পুলিশের তদন্তের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠায় ঘটনাটি ঘিরে রংপুরে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নাগরিক কমিটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানালেও পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে এসব প্রশ্নের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

এই শাখার আরও খবর

ঢাকায় ইসলামপন্থীদের উত্থান, ভারতকে ‘কূটনীতি ও চাপের’ নতুন নীতি নেওয়ার পরামর্শ

বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব বাড়ছে দাবি করে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় ভারতকে নতুন কৌশল নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স্টপোস্ট। ২৯ আগস্ট প্রকাশিত এক…

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বাংলাদেশে ৬ লাখ চাকরি ঝুঁকিতে, বাড়তে পারে দারিদ্র্য: বিশ্বব্যাংক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে চলতি বছর প্রায় ৬ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে এবং দেশে দারিদ্র্যের হারও আরও বাড়তে পারে…

সীমান্তে মাছ ধরতে গিয়ে বাংলাদেশে আটক আসামের যুবক

ভারতের আসাম রাজ্যের শ্রীভূমি জেলার ৩৫ বছর বয়সী এক যুবককে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ এবং মাদক ও অস্ত্র পাচারের অভিযোগে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।…

ধর্মীয় চাপের মুখে সাংস্কৃতিক অঙ্গন, উঠছে নানা প্রশ্ন

বাংলাদেশে ধর্মীয় উত্তেজনা ও রক্ষণশীল গোষ্ঠীর আপত্তির কারণে গান, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ বা বাতিলের ঘটনা বাড়ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় শিল্পী, শিক্ষাবিদ…

রংপুরে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু: বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও সংসদে বিবৃতির দাবি

রংপুরের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যের রহস্যজনক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে সরকারের সুস্পষ্ট বিবৃতির দাবি…

সিক্রেট হারবারে ওয়ান নেশনের ঐতিহাসিক জয়, বড় ধাক্কায় লেবার

অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া রাজ্যের সিক্রেট হারবার আসনের উপনির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়ের দাবি করেছে পলিন হ্যানসনের নেতৃত্বাধীন ওয়ান নেশন। লেবারের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au