সিক্রেট হারবার আসনের উপনির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়ের দাবি করেছে পলিন হ্যানসনের নেতৃত্বাধীন ওয়ান নেশন।ছবি: সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া রাজ্যের সিক্রেট হারবার আসনের উপনির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়ের দাবি করেছে পলিন হ্যানসনের নেতৃত্বাধীন ওয়ান নেশন। লেবারের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে ওয়ান নেশনের প্রার্থী লুক হারডেগেন বড় ব্যবধানে এগিয়ে থেকে জয় দাবি করেছেন। শনিবারের ভোট গণনায় দুই দলের পছন্দের ভোটের হিসাবে হারডেগেন পেয়েছেন ৫৩ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট, আর লেবারের প্রার্থী জর্জিয়া ট্রি পেয়েছেন ৪৬ দশমিক ১ শতাংশ। এতে লেবারের বিরুদ্ধে প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটের বড় পরিবর্তন দেখা গেছে।
দীর্ঘদিনের লেবার এমপি ও সাবেক মন্ত্রী পল পাপালিয়া পদত্যাগ করার পর সিক্রেট হারবার আসনে এই উপনির্বাচনের আয়োজন করা হয়। ভোট গণনার শুরু থেকেই এগিয়ে ছিলেন লুক হারডেগেন। স্থানীয় সময় শনিবার রাত সাড়ে ৯টার পর তিনি আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের আগেই নিজের জয় দাবি করেন।
জয়ের পর লুক হারডেগেন বলেন, সিক্রেট হারবারের ভোটাররা এমন একটি বার্তা দিয়েছেন, যার প্রভাব অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে পড়বে। তিনি দাবি করেন, ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ায় লেবার দলের দীর্ঘদিনের আধিপত্য আর আগের মতো নেই এবং এখন দেশটির কোনো লেবার আসনকেই নিরাপদ বলা যাবে না।
তবে লেবারের প্রার্থী জর্জিয়া ট্রি তখনো পরাজয় মেনে নেননি। তিনি বলেন, ভোট গণনার একটি বড় অংশ তখনো বাকি ছিল। তাই চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে লড়াইকে উন্মুক্ত হিসেবেই দেখছিলেন তিনি। ট্রি স্বীকার করেন, লেবারের জন্য রাতটি কঠিন হয়ে উঠেছে।
সিক্রেট হারবারে এই ফল ওয়ান নেশনের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার নিম্নকক্ষের কোনো আসন এর আগে কখনো জিততে পারেনি দলটি। ফলে লেবারের দীর্ঘদিনের একটি শক্ত ঘাঁটি দখল করতে পারলে এটিই হবে রাজ্যটির রাজনীতিতে ওয়ান নেশনের বড় ধরনের সাফল্য।
ওয়ান নেশন নেতা পলিন হ্যানসন ফলাফলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, এটি লেবারের প্রতি ভোটারদের একটি স্পষ্ট বার্তা। তার দাবি, মানুষ এখন পরিবর্তনের প্রত্যাশায় ওয়ান নেশনের দিকে ঝুঁকছে। তিনি এই ফলকে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজের নেতৃত্বাধীন ফেডারেল সরকারের জন্যও সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, উপনির্বাচনে লিবারেল পার্টির প্রার্থী রায়ান রবার্টসন তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন। তিনি ভোটের রাতেই পরাজয় মেনে নেন। লেবারের প্রার্থী জর্জিয়া ট্রি এর আগে ফেডারেল সম্পদমন্ত্রী ম্যাডেলিন কিংয়ের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া তিনি জ্বালানি প্রতিষ্ঠান উডসাইডে করপোরেট সম্পর্ক বিভাগেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ওয়ান নেশনের প্রার্থী লুক হারডেগেন একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী। নিউ সাউথ ওয়েলসের নিউক্যাসেলে বেড়ে ওঠা হারডেগেন বিভিন্ন শ্রমজীবী পেশায় কাজ করার পর ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হন। পরে রকিংহ্যামে এনিটাইম ফিটনেসের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি পরিচালনা করেন।
নির্বাচনী প্রচারের সময় হারডেগেনের পুরোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু পোস্ট নিয়েও বিতর্ক হয়। এসব পোস্টে তার অতীতে মাদক ব্যবহারের প্রসঙ্গ উঠে আসে। তবে হারডেগেন দাবি করেন, নিজের অতীতের সেই অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে স্বাস্থ্যকর ও সুখী জীবনযাপনে উৎসাহিত করা।
নির্বাচনের আগে ওয়ান নেশন ও লেবারের মধ্যে একটি প্রচারপত্র নিয়েও উত্তেজনা তৈরি হয়। লেবার এমন একটি স্ক্র্যাচকার্ড ধরনের প্রচারপত্র বিতরণ করে, যেখানে পলিন হ্যানসনের রাজনৈতিক অবস্থান ও ভোট দেওয়ার রেকর্ড নিয়ে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরা হয়। ওয়ান নেশন অভিযোগ করে, প্রচারপত্রটির নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে সেটিকে ওয়ান নেশনের প্রচারণা সামগ্রী বলে ভুল হতে পারে। এ নিয়ে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া ইলেক্টোরাল কমিশনে অভিযোগও জানায় দলটি।
সিক্রেট হারবারের উপনির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয়, বাড়িভাড়া, বন্ধকী ঋণের চাপ, জ্বালানির দাম এবং দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবকাঠামো উন্নয়নের ঘাটতি ছিল বড় ইস্যু। পোর্ট কেনেডি থেকে লেকল্যান্ডস পর্যন্ত বিস্তৃত এই এলাকায় দ্রুত জনসংখ্যা বাড়লেও সড়ক, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
গত বছরের রাজ্য নির্বাচনে সিক্রেট হারবারে লেবারের বিরুদ্ধে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটের পরিবর্তন হয়েছিল। এরপর লেবার নেতৃত্বাধীন ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া সরকার স্থানীয় জনগণের অসন্তোষ কমাতে কমিউনিটি সুবিধা, সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের অর্থ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর এখন সিক্রেট হারবারের এই ফলাফলের দিকে। কারণ, ২০২৮ সালের ফেডারেল নির্বাচনের আগে ওয়ান নেশনের এই অগ্রগতি অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে লেবারের দীর্ঘদিনের আসনে বড় ধরনের ভোট পরিবর্তন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজের দল এবং লিবারেল পার্টি উভয়ের জন্যই নতুন করে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের কারণ হতে পারে।