কোক স্টুডিওর শুটিংয়ে সোনারগাঁয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্তের অভিযোগ। ছবিঃ সংগৃহীত
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ঐতিহাসিক বড় সরদারবাড়িতে ‘কোক স্টুডিও বাংলা’ চতুর্থ মৌসুমের শুটিংয়ের সময় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে সেখানে কোকা-কোলার একটি বিজ্ঞাপনের শুটিংও করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি।
শনিবার নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন সংগঠনটির আহ্বায়ক কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েস। তিনি শুটিংয়ের অনুমোদন, ফাউন্ডেশনকে দেওয়া অর্থের হিসাব এবং শুটিংয়ের আগে ও পরের স্থাপনার অবস্থার নথি প্রকাশের দাবি জানান।
শাহেদ কায়েস বলেন, সম্প্রতি টানা চার দিন বড় সরদারবাড়িতে ‘কোক স্টুডিও বাংলা সিজন ৪’-এর ভিডিও ধারণ এবং কোকা-কোলার বিজ্ঞাপনের শুটিং হয়েছে। শুটিংয়ে জেনারেটর, ভারী ক্যামেরা, আলোকসজ্জা, শব্দব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়। এসব সরঞ্জাম স্থাপনা ও এর আশপাশে ব্যবহারের কারণে শুটিং শেষে বড় সরদারবাড়ির দেয়াল, অলংকরণ ও নকশার বিভিন্ন অংশে ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, দ্বিতীয় আঙিনার কাছেও স্থাপনার একটি অংশ ভেঙে গেছে। বড় সরদারবাড়ি শত বছরের পুরোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসম্পদ। এর চুন-সুরকি, ইট, কাঠ, প্লাস্টার, মেঝে ও অলংকরণের মতো উপাদান অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে বাণিজ্যিক শুটিংয়ের সময় ভারী সরঞ্জাম ব্যবহার স্থাপনাটির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে, শুটিংয়ের আগে স্থাপনাটির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিরূপণে কোনো ঐতিহ্যগত প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না। পাশাপাশি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।
তবে স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, বাণিজ্যিক শুটিংয়ের জন্য নির্ধারিত নীতিমালা মেনেই ‘কোক স্টুডিও বাংলা’কে বড় সরদারবাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। শুটিংয়ের কারণে বড় সরদারবাড়ির কোনো স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
তবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়ায় ভবিষ্যতে এ ধরনের বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে ঐতিহাসিক স্থাপনা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র নেওয়ার কথা জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগও করা হয়। কারুপল্লীর দোকান বরাদ্দ, সুবর্ণজয়ন্তী ও বাংলা নববর্ষ উদযাপন এবং স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
এ ছাড়া বড় সরদারবাড়ি মেরামতের নামে ভুয়া বিল তৈরি, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া অর্থ ব্যয় এবং বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণেও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়।
এসব অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছে সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের কোনো ক্ষতি হয়ে থাকলে তা আদায়েরও দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি, সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক কবি রহমান মুজিব, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সহসভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল এবং সোনারগাঁও সাহিত্য নিকেতনের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক মোয়াজ্জেনুল হক উপস্থিত ছিলেন।
ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলম বলেন, লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের বাজেট থেকে প্রয়োজনীয় কাজেই অর্থ ব্যয় করা হয় এবং প্রতিটি ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ রয়েছে।
এদিকে বড় সরদারবাড়িতে শুটিংয়ের সময় স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ‘কোক স্টুডিও বাংলা’র চতুর্থ মৌসুমের গানটির সংগীত কিউরেটর শায়ান চৌধুরী অর্ণবের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
কোক স্টুডিও বাংলার জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা মিলন জানান, বিষয়টি অর্ণবকে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য তারা কিছুটা সময় চেয়েছেন। বর্তমানে অর্ণব কানাডায় অবস্থান করছেন এবং শুক্রবার সন্ধ্যায় সেখানে একটি গানের অনুষ্ঠানে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।