OTN বাংলা বিশেষ প্রতিবেদন: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক মাসের ব্যবধানে বোমা, বিস্ফোরক এবং বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। একই সময়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ছোট ও গোপন ‘সেল’ প্রতিষ্ঠার জন্য আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট – একিউআইএস পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বলে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কিছু উদ্বেগজনক তথ্য। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় কারাগার ভেঙে পালানো জঙ্গি মামলার আসামিদের কয়েকজন এখনো নিখোঁজ। পরবর্তী সময়ে জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আটক কয়েক শ ব্যক্তি জামিনে মুক্ত হয়েছেন। নিষিদ্ধ সংগঠনের পুরোনো সদস্যদের একাংশ পুনরায় সক্রিয় হয়েছে বলে দাবি করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পাকিস্তানের তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান – টিটিপির সঙ্গে বাংলাদেশি তরুণদের যোগাযোগ এবং তাদের পাকিস্তান-আফগানিস্তান অঞ্চলে যাওয়ার তথ্যও বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে।
এর মধ্যেই রংপুরে একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। হত্যার ধরন, পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা এবং তদন্ত নিয়ে ওঠা প্রশ্নের কারণে অনেকে ঘটনাটির সঙ্গে অতীতের জঙ্গি ‘টার্গেট কিলিং’-এর মিল খুঁজছেন। তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত কোনো বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত বা ফরেনসিক প্রমাণ রংপুরের হত্যাকাণ্ডকে জঙ্গি হামলা হিসেবে নিশ্চিত করেনি।
তাহলে বাংলাদেশ কি সত্যিই জঙ্গিবাদের নতুন উত্থানের মুখে? সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলো কি বিচ্ছিন্ন, নাকি পুরোনো কোনো নেটওয়ার্কের পুনর্গঠনের ইঙ্গিত? রংপুরের হত্যাকাণ্ড কি নিছক অপরাধ, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, নাকি আরও বড় কোনো পরিকল্পনার অংশ?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের ইতিহাস, ২০২৪-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এবং সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্ক – তিনটি পর্বে বিশ্লেষণ করেছে OTN বাংলা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ও কারা ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে। বিভিন্ন কারাগারে হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং বন্দি পালানোর ঘটনা ঘটে। কারা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, অস্থিরতার সময় মোট ২ হাজার ২৪০ জন বন্দি পালিয়েছিলেন। তাঁদের অধিকাংশকে পরে গ্রেপ্তার করা হলেও ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ৬৯০ জনের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
কারা মহাপরিদর্শকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পলাতকদের মধ্যে জঙ্গিবাদ-সংশ্লিষ্ট মামলার অন্তত নয়জন আসামি ছিলেন। তাঁদের ছয়জনকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হলেও তিনজন তখনো নিখোঁজ ছিলেন।
নরসিংদী কারাগারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের সময় সার্ভার, ডেটাবেজ এবং অন্যান্য নথি নষ্ট হওয়ায় পালানো ১৬৬ বন্দির পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি বলেও কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা সূত্রে জঙ্গি মামলার আরও বেশি পলাতক আসামির কথা বলা হয়েছে।
দ্বিতীয় পর্ব
২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশ: কারামুক্তি, বিস্ফোরক উদ্ধার ও গোপন সেল তৈরির আশঙ্কা
জামিনে মুক্ত ৩৩৮ জন
বাংলাদেশের কারা কর্তৃপক্ষ ও আদালতের তথ্য উদ্ধৃত করে ২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কারাগারে থাকা ৩৩৮ জন ব্যক্তি জামিনে মুক্ত হয়েছেন।
কিন্তু নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয় তখনই, যখন জামিনে মুক্ত কোনো ব্যক্তি আদালতে হাজির হন না, তাঁর অবস্থান সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য থাকে না কিংবা নতুন কোনো বিস্ফোরক ও সহিংস ঘটনার তদন্তে তাঁর নাম উঠে আসে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলামের মতে, কারাগার থেকে মুক্ত ব্যক্তিদের উগ্র মতাদর্শ থেকে ফিরিয়ে আনার কোনো কার্যকর পুনর্বাসন বা পর্যবেক্ষণব্যবস্থা না থাকলে তাঁরা আগের আদর্শ নিয়েই সমাজে ফিরে যেতে পারেন। রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলার শিথিল পরিবেশ পেলে তাঁদের একটি অংশ পুনরায় সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
পরপর বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধার
সাম্প্রতিক কয়েক মাসে ঢাকা ও এর আশপাশে একাধিক বোমা এবং বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনা এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে।
১২ আগস্ট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় তিনতলা একটি বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম – সিটিটিসি ইউনিট। সেখান থেকে একাধিক বিস্ফোরক, গানপাউডার, পাইপ বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের দাবি করা হয়।

কালো টেপ দিয়ে মোড়ানো প্রেশার কুকার পড়ে আছে মাঠে। ছবি: দ্য ডেইলি স্টার
এর আগে ৩০ জুলাই আশুলিয়ার একটি মুদিদোকানে ফেলে যাওয়া ভ্রমণব্যাগ থেকে বিশেষভাবে তৈরি বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। ২৪ জুলাই মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি ছাতার ভেতর রাখা বোমাসদৃশ বস্তু পাওয়া যায়।

মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পাওয়া বস্তুটি ছিলো আইইডি বোমা। ছবি: সংগৃহীত
জানুয়ারিতে কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসা এবং শরীয়তপুরের জাজিরায় ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা ঘটে। কেরানীগঞ্জের ঘটনায় জঙ্গিবাদ মামলার সঙ্গে আগে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়।
সিটিটিসি কর্মকর্তারা কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, কুমিল্লা, যশোর, মতিঝিল, সাভার, ডেমরা ও সায়েদাবাদের কয়েকটি বিস্ফোরণ এবং বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনার মধ্যে সম্ভাব্য যোগসূত্র অনুসন্ধান করছেন। তাদের সন্দেহ, কাস্টমাইজড আইইডি তৈরির মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে নব্য জেএমবির একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে পারে।
‘বোমারু মামুন’ ও পুরোনো নেটওয়ার্ক
সিটিটিসির তদন্তে নব্য জেএমবির কথিত বোমা প্রশিক্ষক নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’-এর নাম আবার সামনে এসেছে। ২০১৭ সালে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি কারামুক্ত হন এবং পরে ২০১৭ সালের পান্থপথের হোটেল অলিও মামলায় খালাস পান।

রাজধানীর ডেমরা, মতিঝিল ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে একের পর এক বোমা উদ্ধার ও রহস্যজনক বিস্ফোরণের পর সাভারে উগ্রবাদীদের গোপন আস্তানার সন্ধান মেলায় রাজধানীজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে জানা গেছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘নব্য জেএমবি’ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থাতেই তারা একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করে। এই অপতৎপরতার নেপথ্যে মূল পরিকল্পনাকারী বা ‘নাটের গুরু’ হিসেবে কাজ করেছেন নব্য জেএমবির শীর্ষ বোমা বিশেষজ্ঞ নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’। ছবি: সংগৃহীত
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিকভাবে বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর অধিকাংশের পরিকল্পনাকারী হিসেবে ‘বোমারু মামুনের’ নাম উঠে এসেছে। ওস্তাদ জুয়েল ও মামুনের মধ্যে আগে থেকেই পরিচয় ছিল। পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) করা একটি মামলায় ২০২৩ সালে গ্রেপ্তার হয়ে নরসিংদী জেলা কারাগারে ছিলেন জুয়েল। ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই কারাগার ভেঙে পালিয়ে গেলেও পরদিন গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে পাঠানো হয়।
ওই কারাগারে আগে থেকেই বন্দি ছিলেন বোমারু মামুন। সেখানে জুয়েল ও মামুনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়ে বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। কারাবন্দিদের প্রভাবিত করে তারা একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে বোমারু মামুন ও ওস্তাদ জুয়েলসহ চক্রটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ সদস্য পর্যায়ক্রমে জামিনে কাশিমপুর কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন। মুক্তির পর তারা আত্মগোপনে চলে যান।
কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় নতুন আস্তানা তৈরির পরিকল্পনা করেন মামুন। মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে এবং সাভারের আশুলিয়ায় বোমা উদ্ধারের ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে সাভারে উগ্রবাদীদের একটি গোপন আস্তানার সন্ধান পায় কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।
পরে সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকার একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বাসায় তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, দূরনিয়ন্ত্রিত রিমোট, ডেটোনেটর এবং তৈরি অবস্থায় থাকা নিষ্ক্রিয় পাইপ বোমা উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, সাভারে নব্য জেএমবির জন্য একটি শক্তিশালী বোমা তৈরির গবেষণাগার স্থাপন করাই ছিল বোমারু মামুনের প্রধান লক্ষ্য।
ডেমরা থেকে গ্রেপ্তার জুয়েল ভুঁইয়া ওরফে ‘ওস্তাদ’ও ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নরসিংদী কারাগার থেকে পালানো বন্দিদের একজন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি জামিনে মুক্ত হন। সিটিটিসির দাবি, মুক্তির পর তিনি আবার বোমা তৈরির নেটওয়ার্কে যুক্ত হন।
জাতিসংঘের সতর্কবার্তা
২০২৬ সালের ১০ আগস্ট জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ‘অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম’-এর ৩৮তম প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনের ১০১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, একিউআইএস একটি খণ্ডিত গোষ্ঠী থেকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনে রূপান্তরিত হচ্ছে।

১০ আগস্ট প্রকাশিত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, আফগানিস্তানে আল-কায়েদার উপস্থিতি অটুট রয়েছে এবং এর আঞ্চলিক শাখা আল-কায়েদা ইনটেনসিটিস (একিউআইএস) বিচ্ছিন্ন সেলগুলোর মাধ্যমে আরও সংগঠিত একটি নেটওয়ার্কে পরিণত হচ্ছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশে একিউআইএস সেল প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
সংগঠনটি বড় ইউনিটের পরিবর্তে ছোট, বিচ্ছিন্ন ও ছড়িয়ে থাকা সেলের মাধ্যমে কাজ করছে এবং নিজস্ব লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সেল প্রতিষ্ঠার জন্য একিউআইএস পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বলে উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। তবে জাতিসংঘ বাংলাদেশে ইতিমধ্যে আল-কায়েদার ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে – এমন কথা বলেনি এবং কোনো সক্রিয় সেলের অবস্থানও উল্লেখ করেনি। ফলে এটিকে নিশ্চিত উপস্থিতির ঘোষণা নয়, বরং আগাম নিরাপত্তা সতর্কতা হিসেবে দেখা প্রয়োজন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একিউআইএসের নেতৃত্ব আফগানিস্তানের কাবুলে অবস্থান করছে এবং তাদের সঙ্গে তালেবানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ইঙ্গিত রয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লালকেল্লার কাছে হামলার দায় আনুষ্ঠানিকভাবে একিউআইএসের ওপর বর্তানোর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোর সঙ্গে একিউআইএসের কোনো যোগাযোগ আছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সিটিটিসি। তবে সংগঠনটির সেল গড়ার চেষ্টা সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রকাশ্যে নিশ্চিত তথ্য দেয়নি।
সরকারের দুই বিপরীত ভাষ্য
২০২৬ সালের এপ্রিলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই বলে দাবি করেছিলেন। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ভিন্ন বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে জঙ্গি হুমকিকে অতিরঞ্জিত করা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে কোনো জঙ্গি নেই বলে দাবি করা – দুটিই চরম অবস্থান। তাঁর ভাষায়, “বাংলাদেশে একটা পর্যায়ে মিলিট্যান্সি–জঙ্গিবাদ ছিল, আছে।” সরকার একে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করবে বলেও তিনি জানান। প্রথম আলোর প্রতিবেদন
সিটিটিসি কর্মকর্তারা জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, এই মুহূর্তে বড় ধরনের নাশকতার সুনির্দিষ্ট আশঙ্কা নেই এবং প্রতিটি বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা আলাদাভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।
কিন্তু একই সময়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং আটটি বিমানবন্দরে উচ্চ সতর্কতা জারি, নজরদারি বৃদ্ধি এবং পোশাকে ও সাদা পোশাকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েনের খবর সামনে আসে। এই ব্যবধান সরকার ও নিরাপত্তা সংস্থার জনসম্মুখের ভাষ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের ঝুঁকি মূল্যায়নের পার্থক্য নির্দেশ করে।
বাংলাদেশ থেকে টিটিপিতে সদস্য সংগ্রহ
বাংলাদেশের জঙ্গি নেটওয়ার্ক এখন শুধু দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয় – এমন আশঙ্কার বড় উদাহরণ পাকিস্তানের টিটিপির সঙ্গে বাংলাদেশি তরুণদের যোগাযোগ।
২০২৫ সালে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ফয়সাল ও আহমেদ জুবায়ের নামে দুই বাংলাদেশি তরুণ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তাঁদের টিটিপির সদস্য বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে টিটিপির সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে বাংলাদেশে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

ফয়সালের অস্ত্র হাতে তোলা একটি ছবি দেখে তাকে নিজের ভাই হিসেবে শনাক্ত করেছেন বড় ভাই আরমান হোসেন। ছবি: বাংলাদেশ টুডে
মামলার তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের একজন সৌদি আরব, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান হয়ে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন। অন্যজন উত্তর ওয়াজিরিস্তানে অভিযানে নিহত হন।
ফয়সালের অস্ত্র হাতে তোলা একটি ছবি দেখে তাকে নিজের ভাই হিসেবে শনাক্ত করেছেন বড় ভাই আরমান হোসেন। আরমান দ্য ডিসেন্ট-কে জানান, হিজামা সেন্টারে চাকরি করার উদ্দেশ্যে দুবাই যাচ্ছেন—এ কথা বলে ২০২৪ সালের মার্চে দেশ ছাড়েন ফয়সাল। গত কোরবানির ঈদের আগে পরিবারের সঙ্গে তার সর্বশেষ যোগাযোগ হয়েছিল। এরপর পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার চেষ্টা করেও তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেননি।
ফয়সালের বাবা পেশায় ইলেকট্রিশিয়ান। বড় ভাই আরমান হোসেন অনলাইন বিপণন প্রতিষ্ঠান দারাজে ডেলিভারিম্যান হিসেবে কর্মরত।
পাকিস্তানভিত্তিক সাংবাদিক জাওয়াদ ইউসুফজাই তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সদস্যদের নিহত হওয়ার ঘটনাস্থলের কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। তার দাবি, পাকিস্তানের কারাক অঞ্চলে নিহত ব্যক্তিদের একজনের মরদেহের কাছ থেকে বাংলাদেশি পরিচয়পত্র, অর্থ এবং অন্যান্য নথি উদ্ধার করেছেন দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা।
অন্যদিকে, টিটিপির হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছেন বলে পরিচয় দেওয়া এক বাংলাদেশি ব্যক্তিও নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ফয়সালের ছবি প্রকাশ করে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল উত্তর ওয়াজিরিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বোমা হামলায় টিটিপির ৫৪ সদস্যের সঙ্গে আহমেদ জোবায়ের নামে এক বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
দ্য ডিসেন্ট-এর গত মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুসারে, এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে অন্তত চার বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনার পর টিটিপির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গত জুলাইয়ে বাংলাদেশে অন্তত দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তদন্তকারীদের দাবি, ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হায়দার নামে এক ব্যক্তি বাংলাদেশ থেকে টিটিপির জন্য সদস্য সংগ্রহ, ধর্মীয় উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করা এবং পাকিস্তান-আফগানিস্তান অঞ্চলে পাঠানোর নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন।
‘ফতেহ কমব্যাট সিস্টেম’ নামের একটি সংগঠন মার্শাল আর্ট বা আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণের আড়ালে তরুণদের বাছাই ও উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করছে – এমন অভিযোগও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু সংবাদ প্রতিবেদনে এসেছে। তবে এই অভিযোগের অনেক অংশ এখনো স্বাধীন তদন্ত বা আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই।
জঙ্গিবাদের অর্থনীতি
জঙ্গিবাদ শুধু ধর্মীয় উগ্রতার ওপর টিকে থাকে না; এর জন্য প্রয়োজন অর্থ, আশ্রয়, যোগাযোগ, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশের মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব আর্থিক অবকাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা হয়েছে।

মৌলবাদী অর্থনীতি নিয়ে অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের গবেষণা
বার্ষিক মুনাফা ২,৫০০ কোটি টাকা
অধ্যাপক আবুল বারকাতের পুরোনো এক গবেষণায় মৌলবাদী অর্থনীতির বার্ষিক নিট মুনাফা ২ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা বলে অনুমান করা হয়েছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা, ব্যাংক-বীমা, রিয়েল এস্টেট, পরিবহন, ব্যবসা ও এনজিওর মাধ্যমে এই অর্থনীতি পরিচালিত হয় বলে গবেষণাটিতে দাবি করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মসজিদ, মাদ্রাসা, মানবিক সহায়তা ও কল্যাণমূলক প্রকল্পের নামে আসা অর্থের একটি অংশ উগ্রবাদী নেটওয়ার্কে যাওয়ার অভিযোগও বহু পুরোনো। ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল ব্যবহার করা হলে সেই অর্থের গন্তব্য শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অনুদানের এসব অর্থ কিভাবে খরচ হচ্ছে এজন্য প্রয়োজন সন্দেহভাজন লেনদেনের আর্থিক গোয়েন্দা তদন্ত, দাতা ও সুবিধাভোগীর পরিচয় যাচাই এবং আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ। কিন্তু বাস্তবে এসব উদ্যোগের কার্যকর কোনো অনুসরণ বা ধারাবাহিক তদন্ত না থাকায় জঙ্গিবাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
আরো পড়ুন
OTN বাংলা এক্সক্লুসিভ-প্রথম পর্ব
তৃতীয় পর্ব…আসছে চোখ রাখুন OTN বাংলায়