মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে চলতি বছর প্রায় ৬ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে এবং দেশে দারিদ্র্যের হারও আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি, সার ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়তে পারে কর্মসংস্থান, মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতি ইতোমধ্যে অবনতির দিকে গেছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে।
চলতি বছর পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত তৈরি না হলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে আসতে পারতেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে নেমে আসতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের এই মূল্যায়ন ১৫ জুন চূড়ান্ত করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি, সার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার বাজেট সহায়তার জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে আবেদন করেছিল। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই দেশের অর্থনীতির ওপর সংকটের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে এই মূল্যায়ন করা হয়।
বিশ্বব্যাংক বলছে, সংকটের অন্যতম বড় প্রভাব পড়তে পারে পণ্যের দামের ওপর। চলতি বছর মূল্যবৃদ্ধির কারণে দারিদ্র্য বাড়ার প্রবণতার প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাখ্যা করা হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদরেও পড়তে পারে।
জ্বালানি ও কাঁচামালের ব্যয় বাড়ার ফলে উৎপাদন খাতেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী নিয়োগ কমিয়ে দিতে পারে বা বিদ্যমান কর্মসংস্থান ধরে রাখতে সমস্যায় পড়তে পারে। এতে শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষের চাকরিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের সামগ্রিক প্রভাবে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আয় কমে গেলে বা কর্মসংস্থান হারালে মূল্যস্ফীতির কারণে বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার মধ্যপ্রাচ্যের সংকট মোকাবিলায় বাজেট সহায়তা চাওয়ার পর বিশ্বব্যাংক সহায়তা দিতে সম্মত হয়। তবে সংস্থাটি শর্ত দেয়, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ থাকা কিন্তু এখনো ব্যবহার না হওয়া অর্থ একত্র করে বাজেট সহায়তার কাজে ব্যবহার করা হবে।
এরপর ২৬ জুন বাংলাদেশকে ৭১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেট সহায়তা অনুমোদন করে বিশ্বব্যাংক। অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা, প্রয়োজনীয় আমদানি ব্যয় সামলানো এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখতে এই সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি যুদ্ধের প্রভাব না ফেললেও জ্বালানি ও পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার মাধ্যমে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর অর্থনীতির কারণে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বেড়ে গেলে উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা পর্যন্ত এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর চাপ আরও বাড়তে পারে এবং দারিদ্র্য কমানোর সাম্প্রতিক অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।