বাংলাদেশিকে হত্যার পর নিজের মাথায় সৌদি যুবকের গুলি
সৌদি আরবের তায়েফে মো. কামরুল হোসেন (৩৭) নামে এক প্রবাসী বাংলাদেশি যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। পরে হামলাকারী এক সৌদি যুবক নিজের মাথায় গুলি…
বিশেষ প্রতিবেদন: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক মাসের ব্যবধানে একাধিক বোমা, বিস্ফোরক এবং বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের খবর সামনে এসেছে। এর মধ্যেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট – একিউআইএস বাংলাদেশে ছোট ও গোপন সেল গঠনের সুযোগ খুঁজছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারাগার ভেঙে পালানো বন্দি, জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আটক শত শত ব্যক্তির জামিনে মুক্তি, আদালতে অনুপস্থিত থাকা আসামি এবং পুরোনো জঙ্গি নেটওয়ার্কের সদস্যদের কথিত পুনঃসক্রিয়তা – সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, এই মুহূর্তে বড় ধরনের জঙ্গি হামলা বা নাশকতার সুনির্দিষ্ট আশঙ্কা নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন, দেশে জঙ্গিবাদ ছিল এবং এখনো আছে। তাঁর ভাষায়, সমস্যাটিকে অস্বীকার করলে তার চিকিৎসাও সম্ভব নয়।
এর মধ্যেই রংপুরে একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। হত্যার ধরন, পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা এবং তদন্ত নিয়ে ওঠা প্রশ্নের কারণে অনেকে ঘটনাটির সঙ্গে অতীতের জঙ্গি ‘টার্গেট কিলিং’-এর মিল খুঁজছেন।
তাহলে বাংলাদেশ কি সত্যিই জঙ্গিবাদের নতুন উত্থানের মুখে? সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলো কি বিচ্ছিন্ন, নাকি পুরোনো কোনো নেটওয়ার্কের পুনর্গঠনের ইঙ্গিত? রংপুরের হত্যাকাণ্ড কি নিছক অপরাধ, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, নাকি আরও বড় কোনো পরিকল্পনার অংশ?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের ইতিহাস, ২০২৪-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এবং সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্ক – তিনটি পর্বে বিশ্লেষণ করেছে OTN বাংলা। আজ তৃতীয় পর্বঃ প্রকাশিত হলো।
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং কিশোর ছেলে আয়ুষ ওরফে প্রিয়মকে নিজ বাড়িতে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
একই পরিবারের চার সদস্যকে আলাদা স্থানে হত্যা, গলায় ফাঁসের চিহ্ন, মরদেহ উদ্ধারে বিলম্ব এবং তদন্তের ঘটনাক্রমে অসংগতি – এসব কারণে পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য নিয়ে পরিবারের স্বজন ও নাগরিক সমাজের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মা ও মেয়েকে যৌন নির্যাতন, মুখে রাসায়নিক ব্যবহার এবং হত্যাকাণ্ডে জঙ্গিদের সম্পৃক্ততা নিয়ে বিভিন্ন দাবি ছড়িয়েছে।
ময়নাতদন্তের সম্পূর্ণ প্রতিবেদন, ডিএনএ ও যৌন নিপীড়ন পরীক্ষার ফল, অপরাধস্থলের ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং ব্যবহৃত আলামতের পরীক্ষার ফল এখন পর্যন্ত কোন কিছুই পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চারজনকে হত্যার খবরে স্বজনদের আহাজারি। ছবিঃ সংগৃহীত
রংপুরের হত্যাকাণ্ডকে অতীতের জঙ্গি টার্গেট কিলিংয়ের সঙ্গে তুলনা করার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, নিহত চারজনই একই ধর্মীয় সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্য। দ্বিতীয়ত, পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার মতো পরিকল্পিত সহিংসতা মানুষের মধ্যে সাধারণ অপরাধের চেয়ে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করে। তৃতীয়ত, অতীতে বাংলাদেশের জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো পুরোহিত, শিক্ষক, লেখক, ব্লগার, প্রকাশক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে একই ধরনের ভয়ভিত্তিক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেছে।
জঙ্গি বা সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন বা একটি পরিবারকে আক্রমণ করলে তার প্রভাব শুধু সরাসরি ভুক্তভোগীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পুরো সম্প্রদায়ের মধ্যে অনিরাপত্তা ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ নিজের বাড়ি, পেশা, ধর্মীয় পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত কেউ কেউ এলাকা বা দেশ ছাড়ার কথা ভাবতে বাধ্য হন। নিরাপত্তা বিশ্লেষণে এই প্রক্রিয়াকে ‘terror-induced displacement’ বা সন্ত্রাসসৃষ্ট বাস্তুচ্যুতি বলা হয়।
রংপুরের ঘটনায় পুলিশের ভাষ্য বারবার পরিবর্তন, অপরাধস্থলের আলামত সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কথিত স্বীকারোক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা জনমনে সন্দেহ বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘জজ মিয়া’ কাহিনি দেখিয়েছে, একটি সাজানো বয়ান কীভাবে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে পারে এবং তদন্তব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ধ্বংস করতে পারে। ফলে রংপুরের ঘটনায় স্বাধীন ও বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি অযৌক্তিক নয়।
এদিকে সারা বিশ্বে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এ নিয়ে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে বিধায় বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত এবং সঠিক বিচারের দাবিতে মানববন্ধন এবং বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। রংপুরের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যের রহস্যজনক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে সরকারের সুস্পষ্ট বিবৃতির দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সন্দেহ বাড়ছে। ছবিঃ সংগৃহীত
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে রাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো – হুমকি অস্বীকার করা। কিছুদিন আগে সাবেক সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় দাবি করেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একাধিকবার সতর্ক করে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে দেশ জঙ্গিগোষ্ঠীর দখলে চলে যেতে পারে। তাদের বক্তব্য সত্য প্রমাণিত হলে তা বর্তমান সরকারের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হবে। সে কারণেই সরকার নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার না করে দেশে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব বা বিস্তারের আশঙ্কাকে অস্বীকার কিংবা গুরুত্বহীন হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে—এমন প্রশ্ন ও সন্দেহ জনমনে তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টের (একিউআইএস) প্রতিষ্ঠিত ঘাঁটির কথা উঠে আসা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়। দেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই বলে সমস্যাটিকে পুরোপুরি অস্বীকার করাও বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা, পুরোনো জঙ্গি সদস্যদের পুনরায় সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের উপস্থিতি সম্পর্কে পাওয়া তথ্য—সবকিছুই বিষয়টির গুরুত্বকে স্পষ্ট করে তুলছে।
জাতিসংঘের মূল্যায়ন, সাভারে বিস্ফোরক উদ্ধার, কারাগার থেকে পালানো আসামি, জামিনের পর নিখোঁজ ব্যক্তি এবং টিটিপির সঙ্গে বাংলাদেশিদের যোগাযোগ – সবগুলো ঘটনা একত্রে একটি নিরাপত্তা ঝুঁকির চিত্র তৈরি করেছে, যা স্বাধীন ও সমন্বিত তদন্ত দাবি করে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গুলশানের হোলি আর্টিজান হামলায় নিহত পুলিশ কর্মকর্তাদের স্মরণে স্থাপিত ভাস্কর্য ভাঙচুর এবং শহীদ কর্মকর্তার নাম সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।
হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক পূর্তিতে ইতালি দূতাবাস স্মরণানুষ্ঠান আয়োজন করলেও বাংলাদেশ সরকার বা পুলিশ কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় স্মরণ আয়োজন না থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গুলশানে হামলার পর ইসলামিক স্টেট জঙ্গি গোষ্ঠী তাদের বার্তা সংস্থা ‘আমাক’ এ পাঁচ হামলাকারীর ছবি প্রকাশ করে। ছবিঃ সংগৃহীত
সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়ে থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু অভিযানের অপব্যবহারের অভিযোগকে ভিত্তি করে জঙ্গি হামলার ইতিহাস, নিহত সাধারণ মানুষ এবং দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন দেওয়া পুলিশ সদস্যদের স্মৃতি মুছে ফেলা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে তারেক রহমান বলেছিলেন, বাংলাদেশ যেন চরমপন্থা ও মৌলবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত না হয় – এ জন্য সবাইকে সোচ্চার থাকতে হবে। সরকার গঠনের পরও তিনি জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা দিয়েছেন।
কিন্তু কারাগার থেকে পালানো জঙ্গি মামলার আসামিদের খুঁজে বের করা, জামিনে মুক্ত ব্যক্তিদের আইনসম্মত পর্যবেক্ষণ, আদালতে সাক্ষ্য ও আলামত সঠিকভাবে উপস্থাপন, বোমা তৈরির নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং অর্থায়নের উৎস বন্ধ না করতে পারলে ‘জিরো টলারেন্স’ কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
বিএনপির নিজের রাজনৈতিক ইতিহাসও এই প্রশ্নে সতর্কতার দাবি রাখে। ২০০১–২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে বাংলা ভাই, জেএমবি এবং দেশব্যাপী বোমা হামলার উত্থান দলটির জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষতি সৃষ্টি করেছিল। উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ বিএনপির সঙ্গে পশ্চিমা দেশ ও ভারতের সম্পর্কেও দীর্ঘদিন অবিশ্বাস তৈরি করেছে।
বর্তমান সরকার যদি আবারও একই ঝুঁকিকে অবমূল্যায়ন করে, তবে তার রাজনৈতিক মূল্য বিএনপিকেই দিতে হতে পারে।
প্রথমত, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে পালানো সব বন্দির হালনাগাদ ও যাচাই করা তালিকা প্রকাশ করতে হবে। জঙ্গি মামলা, সাধারণ অপরাধ, সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন আসামিকে আলাদা শ্রেণিতে দেখাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ৫ আগস্টের পর জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে জামিন পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন নিয়মিত আদালতে হাজির হচ্ছেন এবং কতজন নিখোঁজ – সেই তথ্য প্রকাশ করা দরকার।
তৃতীয়ত, সাভার, আশুলিয়া, মতিঝিল, ডেমরা, কেরানীগঞ্জ ও অন্যান্য এলাকায় উদ্ধার বিস্ফোরকের ফরেনসিক ‘সিগনেচার’ তুলনা করা প্রয়োজন। একই রাসায়নিক, সার্কিট, নির্মাণপদ্ধতি বা প্রশিক্ষকের ছাপ পাওয়া গেলে নেটওয়ার্কের যোগসূত্র শনাক্ত করা সহজ হবে।

সাভারে মসজিদের মাঠ থেকে বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত
চতুর্থত, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনজিওবিষয়ক ব্যুরো এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে সন্দেহজনক অর্থপ্রবাহ অনুসন্ধান করতে হবে।
পঞ্চমত, অনলাইন প্রচারণা, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ এবং ধর্মীয় বা আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণের আড়ালে সদস্য সংগ্রহের অভিযোগ তদন্ত করতে হবে।
ষষ্ঠত, রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডের স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। ময়নাতদন্ত, ডিএনএ পরীক্ষা, সম্ভাব্য যৌন সহিংসতার পরীক্ষা, মোবাইল ফরেনসিক এবং অপরাধস্থলের আলামত বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। জঙ্গি, সাম্প্রদায়িক, রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত – সব সম্ভাবনাই সমান গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ এক দিনে জন্ম নেয়নি। প্রথমে ছিল দাওয়াত, গোপন সদস্য সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণ। এরপর ছোট হামলা। তারপর উদীচী, রমনা বটমূল, ২১ আগস্ট, ৬৩ জেলায় বোমা, টার্গেট কিলিং এবং হোলি আর্টিজান।
প্রতিবারই বড় হামলার আগে ছোট ছোট সতর্কসংকেত ছিল। প্রতিবারই কেউ না কেউ সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা, রাজনৈতিক প্রচারণা কিংবা ‘নাটক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।

জঙ্গিবাদ ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরেই জিরো টলারেন্সের কথা বলে আসছে বাংলাদেশ।ছবি: সংগৃহীত
বর্তমান ঘটনাগুলো অতীতের পুনরাবৃত্তি কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কিন্তু বিস্ফোরক উদ্ধার, পলাতক আসামি, পুরোনো নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য পুনর্গঠন, টিটিপির সঙ্গে বাংলাদেশিদের যোগাযোগ এবং বাংলাদেশে সেল তৈরির একিউআইএসের কথিত চেষ্টা – এসবকে একসঙ্গে বিবেচনা না করা হবে বিপজ্জনক অবহেলা।
রংপুরের গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের হত্যাকাণ্ড জঙ্গি হামলার সাথে সম্পৃক্ত কিনা তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। সংখ্যালঘু পরিবারের চার সদস্যকে নিজ বাড়িতে নিশ্চিহ্ন করার ঘটনা, তদন্তের অসংগতি এবং দেশজুড়ে উগ্রবাদী তৎপরতার নতুন আলামতের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্ক অনুসন্ধান না করা সরকারের দায়িত্বহীনতা।
সরকার কি সমস্যাটির অস্তিত্ব স্বীকার করে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নেবে, নাকি আবারও ‘জঙ্গি নেই’ কিংবা ‘সবই নাটক’ – এই পুরোনো অস্বীকারের আশ্রয় নেবে?
বাংলাদেশের নিরাপত্তা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব এবং রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য এই প্রশ্নের উত্তর এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারামুক্ত ও পলাতক জঙ্গিদের ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া এবং বিভিন্ন সময়ে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া কয়েকজন জঙ্গির বর্তমান অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তাদের অনেকেরই সুনির্দিষ্ট অবস্থানের তথ্য নেই। এর মধ্যে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা কয়েকজনের বিরুদ্ধে আবারও তৎপরতার তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।
২০২৩ সালের ৩০ মে ঢাকার মাদারটেক এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন ইকরামুল হক। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা একিউআইএসের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। তিনি অন্তত পাঁচটি ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন। ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর জামিনে মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন তিনি।
জামিনে মুক্তির পর প্রায় ২২ মাস পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ইকরামুলের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তাঁর বাবা মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীনের দাবি, জামিনে মুক্তির পর তাঁর ছেলে নারায়ণগঞ্জের সানারপাড় এলাকার একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ইকরামুল ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে অবৈধ পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। গ্রেপ্তারের আগে তিনি ময়মনসিংহ থেকে একিউআইএসের কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে তাঁর বিরুদ্ধে ১০টি মামলা রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রযুক্তিতে দক্ষ ইকরামুল একিউআইএসের প্রচার ও সদস্য সংগ্রহের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অনলাইনে সংগঠনের সদস্যদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে। তাঁর মতো কারামুক্ত ব্যক্তিদের আবারও জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এদিকে নব্য জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা ‘বোমারু মামুন’ও ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জামিনে মুক্তি পান বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ২০১৭ সালে রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিওতে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে ব্যবহৃত বোমা তৈরির সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ছিল পুলিশের। ওই বিস্ফোরণে সাইফুল ইসলাম নামে এক তরুণ নিহত হন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে হোটেল ওলিও বিস্ফোরণের মামলায় মামুনসহ সব আসামিকে আদালত খালাস দেন। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, গত ডিসেম্বর থেকে জুলাই পর্যন্ত কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, কুমিল্লা, সায়েদাবাদ, মতিঝিল ও আশুলিয়ার কয়েকটি ঘটনায় মামুন ও তাঁর সহযোগী আরিফের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ১১ আগস্ট আরিফকে গ্রেপ্তারের পর সাভারের শ্যামপুর এলাকায় তাঁর কথিত আস্তানায় অভিযান চালায় সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট। অভিযানে ১৩টি পাইপবোমা ও বোমা তৈরির বিভিন্ন রাসায়নিক উদ্ধারের দাবি করা হয়। এরপর ‘বোমারু মামুনকে’ গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এ ছাড়া গত ১৬ আগস্ট ডেমরা এলাকা থেকে বোমাসদৃশ দুটি বস্তুসহ জুয়েল ভুঞা ওরফে ‘ওস্তাদ’ নামে আরেক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন জুয়েল। পরে ২০২৪ সালে কারাগার থেকে পালিয়ে যান তিনি।
৬৯০ বন্দির এখনো সন্ধান নেই
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া অন্তত ৬৯০ বন্দির এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পলাতক এসব বন্দির মধ্যে জঙ্গিবাদ-সংশ্লিষ্ট মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন নয়জন। তাঁদের মধ্যে ছয়জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি তিনজনের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোতাহের হোসেন।
মঙ্গলবার ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, কারাগারগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে কতজন জঙ্গি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বলা কঠিন।
এর আগে কারা অধিদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কারা মহাপরিদর্শক জানান, ওই সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে মোট ২ হাজার ২৪০ জন বন্দি পালিয়ে যান। তাঁদের অধিকাংশকেই পরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি জানান, নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ১৬৬ বন্দির পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। হামলা ও অগ্নিসংযোগের সময় কারাগারের সার্ভার, তথ্যভান্ডারসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাঁদের পরিচয় শনাক্তে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
কারা মহাপরিদর্শক আরও জানান, দেশের কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৪ হাজার হলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ৯৮ হাজার বন্দি রয়েছে। অতিরিক্ত বন্দির চাপের মধ্যেই কারাগারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
তবে বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ২০ জুলাই নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর নয়জন জঙ্গি কারাগার থেকে পালিয়ে যান। তাঁদের সহযোগীরাই পরিকল্পিতভাবে কারাগারে হামলা চালিয়ে তাঁদের বের করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পালিয়ে যাওয়া ওই নয় জঙ্গির মধ্যে এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া মোট ৯৮ জন জঙ্গির মধ্যে ৭০ জনই সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২৭ জনকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কারাগার থেকে পালানো কিংবা জামিনে মুক্তি পাওয়া জঙ্গিদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে যাঁদের অবস্থান শনাক্ত করা যাচ্ছে না, তাঁদের কেউ আবার সংগঠিত হয়ে জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত হলে তা নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রধান তথ্যসূত্র: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন, প্রথম আলো, ঢাকা ট্রিবিউন এবং ডয়চে ভেলে ও বিবিসি বাংলার সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au