৪ সুইসাইড নোটে যা লিখেছেন পুলক চ্যাটার্জি। ছবিঃ সংগৃহীত
বরিশালে ন্যাশনাল ডেইলিজ ব্যুরো চিফ অ্যাসোসিয়েশনের (এনডিবিএ) সভাপতি ও দৈনিক সমকালের সাবেক ব্যুরো প্রধান, সিনিয়র সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে চারটি সুইসাইড নোটও উদ্ধার করা হয়েছে। এসব নোটে নিজের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী না করার কথা লিখেছেন তিনি। পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পর্ক, মানসিক আঘাত, অনুশোচনা ও ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে উদ্দেশ করে নানা কথা লিখে গেছেন এই সাংবাদিক।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় নগরীর প্যারারা রোডে অবস্থিত দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরো কার্যালয় থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পুলক চ্যাটার্জি আত্মহত্যা করেছেন। তবে কী কারণে তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা তদন্তের পর বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছেন কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন উল ইসলাম।
বর্তমানে সমকালের বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্বে থাকা সাংবাদিক সুমন চৌধুরী জানান, পুলক চ্যাটার্জির কাছে অফিসের একটি চাবি থাকত। তিনি প্রায়ই রাতে অফিসে এসে সেখানে সময় কাটাতেন।

নিহত সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি। ছবি: সংগৃহীত
শুক্রবার সন্ধ্যায় সুমন চৌধুরী অফিসে গিয়ে দেখেন, ভেতর থেকে কার্যালয়টি তালাবদ্ধ। পরে দরজা কিছুটা ফাঁক করে ভেতরে তাকিয়ে তিনি পুলক চ্যাটার্জিকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানানো হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা খুলে তার মরদেহ উদ্ধার করে।
এদিকে পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বরিশালের সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। সহকর্মীদের কাছে সদাহাস্যোজ্জ্বল ও পরিচিত মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি।
স্থানীয় একাধিক জ্যেষ্ঠ সংবাদকর্মী জানান, সমকাল থেকে চাকরি হারানোর পর পুলক চ্যাটার্জি আর্থিকভাবে চরম হতাশায় ছিলেন। তবে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, সেটি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চার সুইসাইড নোটে কী লিখেছেন পুলক
ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া চারটি সুইসাইড নোট বর্তমানে পুলিশের কাছে রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব নোটের বিষয়বস্তুতে পুলক চ্যাটার্জির ব্যক্তিগত সম্পর্ক, মানসিক যন্ত্রণা, অনুশোচনা এবং মৃত্যুর দায় কারও ওপর না দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

সুইসাইড নোট ১
প্রথম নোটে তিনি স্পষ্টভাবে লিখেছেন, তার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নন। ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও আবেগঘন কিছু ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে সেখানে নিজের সিদ্ধান্তের দায় নিজেই নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। কাউকে ভালোবেসে ভুল করা কিংবা সেই সম্পর্কের পরিণতিকে ঘিরে কোনো প্রত্যাশা রাখার বিষয়েও তিনি লিখেছেন।
দ্বিতীয় নোটে তিনি একজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে তাদের মধ্যে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা ও প্রায় তিন বছরের আবেগ-অনুভূতির কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে ওই ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুশোচনা হতে পারে বলেও লিখেছেন তিনি।

সুইসাইড নোট ২
তৃতীয় নোটে মানসিক আঘাত ও নিজের ভেতরের যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেছেন পুলক। সেখানে নিজেকে ভালোবাসার সুযোগ দেওয়া এবং কঠিন বাস্তবতা থেকে নিজেকে গুটিয়ে না নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন। নতুন করে জীবন শুরু করার সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন রেখেছেন তিনি।

সুইসাইড নোট ৩
চতুর্থ ও শেষ নোটটি তুলনামূলকভাবে ছোট। সেখানে ‘দীপক’কে উদ্দেশ করে বিদায় জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি প্রিয়াঙ্কা ও প্রকৃতিকে আগলে রাখার অনুরোধ করেছেন।

সুইসাইড নোট ৪
চারটি নোটের ভাষা ও বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করলে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও মানসিক চাপ তার শেষ সময়ের ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে ধারণা করা যায়। তবে এসব নোটের ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। পুলিশ বলছে, পুরো ঘটনাটি তদন্তের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো স্পষ্ট হবে।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানা গেছে।