রংপুরে ৪ খুনের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি আইনজীবী ঐক্য পরিষদের
রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজন নিহত হওয়ার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ আইনজীবী…
কারাগারের লোহার দরজা খুলেছিল মাত্র পাঁচ ঘণ্টার জন্য। মুক্তির আনন্দে নয়, মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নিতে। প্রায় দুই বছর ধরে বন্দী সনাতনী ধর্মীয় নেতা, সনাতন জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী। চিন্ময় কৃষ্ণ দাস যখন চট্টগ্রামের পুণ্ডরীক ধামে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহের চরণ স্পর্শ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন, তখন সেই অশ্রু শুধু একজন সন্তানহারা পুত্রের ছিল না-সেখানে যেন বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক অনমনীয়তা এবং রাষ্ট্রীয় মানবিকতার সংকটও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের ৭১ বছর বয়সী মা সন্ধ্যা রানী ধর জীবনের শেষ সময়ে একবার তাঁর বন্দী ছেলেকে দেখতে চেয়েছিলেন। পরিবার অসুস্থ মাকে দেখার সুযোগ দিতে শর্তসাপেক্ষ প্যারোলের আবেদনও করেছিল। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অসুস্থ স্বজনকে দেখতে কোনো বন্দীকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার বিধান নেই। মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার জন্য সেই ছেলেকে পাঁচ ঘণ্টার প্যারোল দেওয়া হলো।
আমার প্রশ্ন, আইনের উদ্দেশ্য কি মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা নয়? একজন মৃত্যুপথযাত্রী মা তাঁর সন্তানকে শেষবার দেখতে পারবেন না, কিন্তু মৃত্যুর পর সেই সন্তান তাঁর নিথর দেহের সামনে দাঁড়ানোর অনুমতি পাবেন-এ কেমন নির্মম পরিহাস?
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের খোঁজখবর নিতে গিয়ে তাঁর মায়ের সঙ্গে কথা বলার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। যতবারই তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে, ততবারই তিনি একটিমাত্র আকুতি জানিয়েছেন-“আমি আর কিছু চাই না বাবা, আমার ছেলেটাকে যেন মুক্তি দেওয়া হয়।”
কারাগারে চিন্ময়ের সঙ্গে কথা বলার পর তাঁর মা আমাকে জানিয়েছিলেন, চিন্ময় তাঁকে বলেছিলেন-“আমি শুধু এখান থেকে বের হতে চাই। আমি আর কোনো দিন কোনো বক্তব্য দেব না। আমি বাঁচতে চাই।”
একজন অসহায় মায়ের কণ্ঠে সন্তানের মুক্তির সেই আকুতি আজ আমার কানে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কিন্তু আমি, আমরা আজ বড্ড অসহায় রাষ্ট্র যন্ত্রের কাছে। ক্ষমা করুন মাসিমা।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহসহ একাধিক মামলা রয়েছে। কিছু মামলায় তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন, আবার অন্য মামলার কারণে তাঁর মুক্তি আটকে আছে। চট্টগ্রামে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যার ঘটনায়ও বিচারিক কার্যক্রম চলছে।
বিচার শেষ হওয়ার আগে একজন অভিযুক্ত আইনের চোখে অপরাধী নন। তাঁর বিরুদ্ধে মামলাগুলোর দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্ত বিচার হওয়া জরুরি। এক মামলায় জামিন পাওয়ার পর নতুন বা অন্য মামলার কারণে দীর্ঘদিন কারাবন্দী রাখার প্রক্রিয়াটি কার্যত অনির্দিষ্ট আটকাদেশে পরিণত হয়ে আছে।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, অধিকার ও সুরক্ষার দাবিতে আয়োজিত বিভিন্ন সমাবেশের পরিচিত মুখ ছিলেন। ফলে তাঁর গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ কারাবাসকে কেন্দ্র করে দেশের ভেতরে ও বাইরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা শুরু করার পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের কাজে বাধা, বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার, এমনকি জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে সেই তালিকায়। তাঁর আইনজীবীর দাবি, এসব অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো-সনাতনী সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার আগে দেশের কোথাও তাঁর বিরুদ্ধে একটি মামলা কিংবা সাধারণ ডায়েরিও ছিল না। মামলাগুলো সামনে এসেছে ঠিক তখনই, যখন তিনি সংখ্যালঘুদের ন্যায্য দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছেন।
যে কথিত পতাকা অবমাননার মামলায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে আটক রাখা হয়েছে, তাঁর আইনজীবীর বক্তব্য এবং ওটিএন বাংলার সরেজমিন অনুসন্ধান অনুযায়ী, ওই ঘটনার সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তারপরও এই অভিযোগে তাঁর জামিনের পথ বারবার আটকে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে আইএস ও আল-কায়েদার মতো উগ্রপন্থী সংগঠনের পতাকা প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন-এসব ঘটনার কতটির নিরপেক্ষ তদন্ত হয়েছে এবং কতজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে?
৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর একের পর এক হামলার অভিযোগ উঠেছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ১৫ দিনেই অন্তত ১ হাজার ৬৮টি সংখ্যালঘু পরিবারের ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে দাঁড়িয়েছিলেন।
২৫ অক্টোবর চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে ‘বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চ’-এর ব্যানারে আয়োজিত মহাসমাবেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। সেখান থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও সম-অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আট দফা দাবি উত্থাপন করা হয়।
কিন্তু সেই শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশের পর নিউমার্কেট মোড়ের একটি কথিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে দ্রুততার সঙ্গে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয়। সমাবেশস্থল, অভিযোগের স্থান এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে যে অসংগতি রয়েছে, তা স্বাভাবিকভাবেই বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
একজন সাধু- সন্ন্যাসী ব্যক্তিকে অসুস্থ মায়ের শয্যার পাশে কয়েক ঘণ্টার জন্য নেওয়া কি সত্যিই এত অসম্ভব ছিল? সন্ধ্যা রানী ধর হয়তো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশা করেছিলেন, তাঁর ছেলে আসবে। সেই অপেক্ষা আর শেষ হয়নি। মায়ের জীবদ্দশায় যে রাষ্ট্র পাঁচ ঘণ্টা দিতে পারেনি, তাঁর মৃত্যুর পর সেই রাষ্ট্রই পাঁচ ঘণ্টার প্যারোল অনুমোদন করেছে। কিন্তু তখন আর সাক্ষাৎ হয়নি-হয়েছে শুধু বিদায়।
পুণ্ডরীক ধামে বিগ্রহের চরণে মাথা রেখে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের সেই অশ্রুসিক্ত কান্না আমাদেরভাবে আমাদের বিবেকের সামনে এক গভীর প্রশ্ন প্রশ্ন রেখে ছুড়ে দেয়–এ কেমন রাষ্ট্র, এ কেমন মানবিকতা?
সম্পাদক: ড. প্রদীপ রায়, ওটিএন বাংলা, মেলবোর্ন
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au