নির্মাণকাজের ভিসায় রাশিয়া গিয়ে যুদ্ধের ময়দানে জড়িয়ে পড়েছেন বাংলাদেশি শ্রমিকদের অনেকে। একই দলে ৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় গেলেও তাদের মধ্যে ১৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, দুজন দেশে ফিরেছেন এবং দুজনের কোনো খোঁজ নেই। যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা আরও ছয়জন এখনো বেঁচে আছেন বলে স্বজনদের কাছে তথ্য রয়েছে।
লালমনিরহাটের পাটগ্রামের আল-আমিনও ছিলেন ওই ৩০ জনের একজন। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় গত ৭ মে নির্মাণকাজের ভিসায় রাশিয়ায় যান তিনি। কিন্তু কাজের বদলে এখন তাকে যুদ্ধের ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হচ্ছে। ফ্রন্টলাইনের কাছাকাছি একটি সেনাক্যাম্পে থেকে রুশ সেনাদের খাবার ও গোলাবারুদ সরবরাহ করছেন তিনি।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয় আল-আমিনের সঙ্গে। প্রায় সাত মিনিটের কথোপকথনে তিনি রাশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির ভয়াবহতার বর্ণনা দেন।
আল-আমিন জানান, প্রশিক্ষণ শেষে ১০ জুন থেকে তিনি ফ্রন্টলাইন থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের একটি সেনাক্যাম্পে অবস্থান করছেন। সেখানে তার কাজ রুশ সেনাদের খাবার ও গোলাবারুদ সরবরাহ করা। সরাসরি ফ্রন্টলাইনে না গেলেও প্রতিনিয়ত ড্রোন হামলার আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে তাকে।
তার ভাষায়, ‘ফ্রন্টলাইনে যাইনি। কিন্তু এখানে তকদিরের ওপর টিকে আছি। মৃত্যু লেখা হয়নি বলে বেঁচে আছি। চারপাশে ভয়াবহ অবস্থা। প্রতিনিয়ত ইউক্রেন ড্রোন হামলা করছে। থাকার রুমেও ড্রোন পড়ে। উপরে ড্রোন, নিচে মাইন। প্রাণ হাতে নিয়ে ঘুরছি।’
আল-আমিন জানান, রাশিয়ায় একসঙ্গে যাওয়া ৩০ জনের মধ্যে শুরুতে তার নিজের গ্রুপে সাতজন ছিলেন। এখন তাদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তাদের মধ্যে দুজন ফ্রন্টলাইনে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। তারা মারা গেছেন, নাকি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, সে বিষয়েও নিশ্চিত নন তিনি।
অন্যদিকে একই দলের গোপালগঞ্জের সৌরভ মোল্লা, মাদারীপুরের কামাল হোসেন, কিশোরগঞ্জের আবু হানিফ ও ফরিদপুরের হেলাল শেখসহ কয়েকজনকে বাংকার তৈরির কাজে অন্যত্র পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সৌরভের ভাই তাসলিম মোল্লা।
সৌরভের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তাসলিম মোল্লা বলেন, ওই ব্যাচের ১৮ জন এরই মধ্যে মারা গেছেন। দুজন হাসপাতালে, দুজন দেশে ফিরেছেন এবং দুজনের কোনো খোঁজ নেই। যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা ছয়জন এখনো বেঁচে আছেন।
তবে পলাতক বা নিখোঁজদের বিষয়ে সরকারি কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য পরিবারের হাতে নেই বলে স্বজনদের অভিযোগ।
ফ্রন্টলাইনে গিয়ে বেঁচে ফেরার লড়াই
ওই দলেরই সদস্য ছিলেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের রাজন হোসেন। রাশিয়ায় যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর আগস্টে দেশে ফিরেছেন তিনি। এখনও শারীরিক ও মানসিক ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
রাজন জানান, তাদের দিয়ে ২৪ ঘণ্টা ২৫ থেকে ৪০ কেজি ওজনের ব্যাগ বহন করানো হতো। পাহাড়ি এলাকায় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কাজ করানো হতো। মিসাইল ও গ্রেনেড বহনের কাজও করতে হয়েছে তাকে।
তার অভিযোগ, সেখানে বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো। খাবার হিসেবে দেওয়া হতো গম সিদ্ধ ও গমের গুঁড়া। কান্না করলে মারধর করা হতো এবং গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়া হতো। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও দেওয়া হতো না।
রাজনের বর্ণনায় যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্ত আসে ফ্রন্টলাইনে যাওয়ার দিন। তিনি বলেন, সেদিন তার চোখের সামনে ১৭ জন মারা যান। একপর্যায়ে তার কোমরের ওপর বিস্ফোরণ ঘটে। এতে হাত-পা অবশ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় সেখানে পড়ে থাকার পর হামাগুড়ি দিয়ে চার দিনে ক্যাম্পে ফিরতে সক্ষম হন তিনি।
রাজনের ভাষায়, ‘খাবার দূরে থাক, একফোঁটা পানিও পাইনি।’
আহত হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হলে এক নারী চিকিৎসকের সহায়তায় বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগের সুযোগ পান রাজন। পরে ট্রাভেল পাসের মাধ্যমে দেশে ফেরেন তিনি।
আরেক বাংলাদেশি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আদনান হোসেনও সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন। তার বর্ণনাতেও উঠে এসেছে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা।
আদনান জানান, সেখানে প্রায় প্রতি মুহূর্তেই ড্রোন হামলার আশঙ্কা ছিল। কোথায় মাইন পাতা আছে, তা বোঝার উপায় ছিল না। মাইন বিস্ফোরণে অনেককে মারা যেতে দেখেছেন তিনি। অনেক সময় নিহতদের মরদেহও সেখানেই পড়ে থাকত।
একবার ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার কথাও জানান আদনান। তিনি বলেন, পেছনের দিকে দৌড়ে যাওয়ায় ড্রোনটি তার কাছ থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে বিস্ফোরিত হয়। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি। পরে এক রুশ সেনার সহযোগিতায় দেশে ফেরার সুযোগ পান।
নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে পরিবারের দৌড়ঝাঁপ
একই দলে রাশিয়া যাওয়া চাঁদপুর সদর এলাকার আরিফ হোসেনের পরিবারের কাছে ২৬ মে সর্বশেষ তার একটি ভয়েস বার্তা আসে। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ নেই।
আরিফের বাবা স্বপন পাটওয়ারী জানান, ওই ভয়েস বার্তায় আরিফ জানিয়েছিলেন, তাকে সেনাবাহিনীর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তার সবকিছু নিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য পরিবারের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন তিনি।
এরপর থেকে আরিফ জীবিত আছেন নাকি মারা গেছেন, সে বিষয়ে পরিবার নিশ্চিত হতে পারেনি।
স্বপন পাটওয়ারীর অভিযোগ, ছেলের সন্ধানে তিনি একাধিকবার ঢাকায় গিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য পাননি।
তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে বেঁচে আছে না মরে গেছে, সরকারের লোকজন জানে না। আমি এখনো মৃত্যুর খবর পাইনি। পেলেও বিশ্বাস করতে চাই না।’
গাজীপুরের রিপন হোসেনের পরিবারের অবস্থাও একই। তার মা রিনা বেগম জানান, ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়েছেন। তবে মরদেহ দেশে ফেরত পাবেন কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
বন্ধ হয়নি রাশিয়ায় ‘যুদ্ধের ভিসা’ দেওয়ার অভিযোগ
৩০ বাংলাদেশি শ্রমিককে রাশিয়ায় পাঠানোর পর তাদের যুদ্ধের কাজে জড়িয়ে পড়ার খবর সামনে আসায় সংশ্লিষ্ট তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সরকার আরএস ইন্টারন্যাশনাল, জাবাল-ই-নূর এবং টিএস ওভারসিজ লিমিটেডের লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত করে।
এর ফলে রাশিয়ায় কর্মসংস্থানের নামে বাংলাদেশিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর কথিত প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়ার আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি আরও কয়েকজন তরুণ একই ধরনের ফাঁদে পড়ার অভিযোগ করেছেন।
গত এপ্রিলে সাত যুবক রিক্রুটিং এজেন্সি পাটওয়ারী অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেডের মাধ্যমে ফুড প্যাকেজিংয়ের কাজের ভিসায় রাশিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। তাদের সঙ্গে ছয় লাখ টাকা করে চুক্তি হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
কিন্তু পরে তাদের হাতে যে ভিসা দেওয়া হয়, সেটি রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি দপ্তরের কাজের ভিসা বলে দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে তারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ওই ভিসায় রাশিয়ায় গেলে তাদের যুদ্ধসংশ্লিষ্ট কাজে পাঠানো হতে পারে।
এরপর সাত যুবক রাশিয়া যাওয়া থেকে বিরত থাকেন এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে অভিযোগ করেন।
‘ভিসা দেখে বুঝতে পারি, এটি যুদ্ধের ভিসা’
ভুক্তভোগীদের একজন ঢাকার কেরানীগঞ্জের আসিফ আলী ইফতি। তার লিখিত অভিযোগের একটি কপি প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
আসিফের অভিযোগ, ছয় লাখ টাকার চুক্তিতে ফুড প্যাকেজিংয়ের ভিসায় রাশিয়া যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন তিনি। ভিসা পাওয়ার আগে ৭৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। বাকি টাকা ভিসা পাওয়ার পর দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু গত ২৫ জুন ঢাকার রুশ দূতাবাস থেকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভিসা পাওয়ার পর তার সন্দেহ হয়। তিনি ভিসাটি রাশিয়ায় থাকা এক আত্মীয়কে পাঠালে ওই ব্যক্তি সেটিকে যুদ্ধসংশ্লিষ্ট ভিসা বলে জানান।
আসিফ বলেন, ‘ভিসা পেয়ে অবাক হই। কোনো কোম্পানির নাম নেই। রাশিয়ায় থাকা খালাতো ভাইকে ভিসাটা পাঠালে তিনি এটিকে যুদ্ধের ভিসা বলেন।’
এরপর তিনি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক পরিচয় দেওয়া শাহনাজ পারভিনকে বিষয়টি জানান এবং রাশিয়া যাবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেন। একই সঙ্গে জমা দেওয়া টাকা ও পাসপোর্ট ফেরত চান। কিন্তু তার অভিযোগ, পরে শাহনাজ পারভিন যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।
আসিফের দাবি, টাকা ও পাসপোর্ট কোনোটিই তিনি ফেরত পাননি।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার শাহে আলম ও ফরিদপুরের ইসমাইল হোসেন। তাদের কাছ থেকেও রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। শাহে আলম ৪৫ হাজার এবং ইসমাইল হোসেন ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
রিক্রুটিং এজেন্সি-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, পাটওয়ারী অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেডের মালিকানা এমএ লতিফ পাটওয়ারীর নামে রয়েছে। তবে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তারা শুধু শাহনাজ পারভিনকে চেনেন। এমএ লতিফকে তারা ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া ভিজিটিং কার্ডে শাহনাজ পারভিনকে এজেন্সিটির পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শাহনাজ পারভিনের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে এমএ লতিফ পাটওয়ারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে রাশিয়ায় যুদ্ধসংশ্লিষ্ট ভিসার কারবারে তার এজেন্সি জড়িত কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।
স্বজনদের প্রশ্ন, কাজের জন্য গিয়ে যুদ্ধের ময়দানে কেন?
রাশিয়ায় যাওয়া বাংলাদেশিদের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, তারা স্বজনদের যুদ্ধ করতে পাঠাননি। বৈধ কর্মসংস্থানের আশায় রাশিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাদের যুদ্ধসংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত হতে হয়েছে।
সৌরভ মোল্লার ভাই তাসলিম মোল্লার প্রশ্ন, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার জন্য ভাইকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তারা। এখন সেই ভাইকেই প্রাণ হাতে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকতে হচ্ছে।
পরিবারগুলোর অভিযোগ, নিখোঁজ ও আটকে পড়া স্বজনদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসে বারবার যোগাযোগ করেও তারা পর্যাপ্ত তথ্য বা কার্যকর সহায়তা পাচ্ছেন না।
রাশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের নামে বাংলাদেশি নাগরিকদের যুদ্ধসংশ্লিষ্ট কাজে জড়িয়ে পড়ার এসব অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য পাঠানোর আগে ভিসার ধরন, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান, কাজের প্রকৃতি এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা সম্পর্কে সরকারি পর্যায়ে আরও কঠোর যাচাই প্রয়োজন। একই সঙ্গে ইতোমধ্যে নিখোঁজ ও যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে থাকা বাংলাদেশিদের অবস্থান শনাক্ত করে তাদের নিরাপদে দেশে ফেরাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি।