দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ। ছবিঃ সংগৃহীত
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন বিরোধী রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন ও বিভিন্ন নাগরিক গোষ্ঠীর নেতাকর্মীরা। বিক্ষোভ ঘিরে শুক্রবার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে আম আদমি পার্টির (এএপি) নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ, সঞ্জয় সিং, সাবেক দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অতিশী, রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) নেতা মনোজ ঝা এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা রয়েছেন।
ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে এই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ), স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (এসএফআই), ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (এনএসইউআই)সহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সদস্যরা এতে অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি ছিল সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়নি। এ কারণে যন্তর মন্তর, পার্লামেন্ট স্ট্রিট ও আশপাশের এলাকায় আগেই নিষেধাজ্ঞা জারি এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়। কয়েকটি স্থানে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভকারীদের যন্তর মন্তরের দিকে যেতে বাধা দেয়। তবে বিভিন্ন দিক থেকে বিক্ষোভকারীরা সেখানে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের আটক করে বাসে করে বিভিন্ন থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
দিল্লি পুলিশের হিসাবে দুপুরের পর আটক ব্যক্তির সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়ে যায়। এর আগে দুপুরে প্রায় ৫০০ জনকে আটকের খবর পাওয়া গিয়েছিল। পরে বিভিন্ন স্থান থেকে আরও বিক্ষোভকারী আটক হওয়ায় সংখ্যাটি ৭০০-এর বেশি হয়। পুলিশের বাসে করে আটক ব্যক্তিদের বদরপুর, ফতেহপুর বেরি, আউটার নর্থ দিল্লিসহ বিভিন্ন থানায় নেওয়া হয়।
আটক নেতাদের মধ্যে ছিলেন এএপি দিল্লি শাখার প্রধান সৌরভ ভরদ্বাজ, রাজ্যসভার সদস্য সঞ্জয় সিং এবং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অতিশী। এআইএসএর জাতীয় সভাপতি নেহা বোরাও আটক হন। রাজনৈতিক কর্মী যোগেন্দ্র যাদব এবং বামপন্থী নেত্রী বৃন্দা কারাতসহ আরও কয়েকজন রাজনৈতিক ও ছাত্রনেতাকে আটকের খবর পাওয়া গেছে।
এআইএসএ নেত্রী নেহা বোরাকে আটকের সময় নারী পুলিশ সদস্যদের নামফলক না থাকার বিষয়টিও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরে পুলিশের বাস থেকে বেরিয়ে আসার পর প্রকাশ করা এক ভিডিও বার্তায় নেহা বোরো বলেন, মানুষ ঐক্যবদ্ধ এবং রাস্তায় থাকা বিক্ষোভকারীরা বারবার আটক ব্যক্তিদের মুক্ত করে দিচ্ছেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের আবার যন্তর মন্তরে ফিরে এসে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
বিক্ষোভ চলাকালে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দলে বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নেন। পুলিশ ১০ জনের বেশি মানুষ একসঙ্গে জড়ো হলে তাদের সরিয়ে দেয় এবং অনেককে আটক করে। যন্তর মন্তরের মূল প্রবেশপথ বন্ধ রাখার পাশাপাশি পার্লামেন্ট স্ট্রিট ও আশপাশের সড়কেও পুলিশি নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এসআইআর। তাদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক যোগ্য ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে। বিরোধী দল ও ছাত্রসংগঠনগুলোর একাংশ আরও অভিযোগ করছে, ভোটার তালিকার পরিবর্তন রাজনৈতিকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে জবাবদিহি দাবি করছে এবং সিইসির পদত্যাগ চাচ্ছে।
তবে নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এসআইআরের উদ্দেশ্য হলো ভোটার তালিকা থেকে একই ব্যক্তির একাধিক নাম, মৃত ব্যক্তির নাম এবং ভোট দেওয়ার যোগ্যতা নেই এমন ব্যক্তিদের নাম শনাক্ত করে তালিকা সংশোধন করা। অর্থাৎ, বিক্ষোভকারীদের ‘গণহারে যোগ্য ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার’ অভিযোগের সঙ্গে কমিশনের ব্যাখ্যার স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
মুম্বাইয়েও সিইসির পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ
এদিকে একই দিনে মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কেও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ আয়োজন করে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে আসছেন। তার অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম এবং ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে।
মুম্বাই পুলিশ প্রথমে শিবাজি পার্কে কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি। এরপরও শুক্রবার সেখানে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হতে শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিবাজি পার্ক ও দাদর রেলস্টেশন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ সরঞ্জাম ও নজরদারি ব্যবস্থাও রাখা হয়।
পরে শিবাজি পার্ক এলাকায় সিজেপির কর্মসূচিতে শত শত মানুষ জড়ো হন। দলটির নেতাকর্মীরা সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেন। সিজেপি ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া স্থগিত করা, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা আনা এবং কমিশনের কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে জানিয়েছেন, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দলটি মুম্বাইয়ের কর্মসূচির পর আরও কয়েকটি শহরে আন্দোলন করার কথা জানিয়েছে।
দিল্লি ও মুম্বাইয়ের এই কর্মসূচি মূলত ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্ককে সামনে এনেছে। একদিকে বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠন এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং যোগ্য ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে সিইসির পদত্যাগ দাবি করছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন বলছে, ভোটার তালিকা শুদ্ধ ও নির্ভুল রাখার লক্ষ্যেই এই সংশোধন প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে। শুক্রবারের বিক্ষোভ ও ব্যাপক আটকের মধ্য দিয়ে বিষয়টি নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে।
সূত্রঃ এএনআই