মিরপুরের হতাশা পেছনে ফেলে সিলেটে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ
সিলেটের মাঠ কি বাংলাদেশের জন্য পয়া? পরিসংখ্যান বলছে, উত্তরটা সহজ নয়। এই মাঠে এখন পর্যন্ত ছয়টি টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ। জয় ও পরাজয় সমান তিনটি করে।…
ভাস্কর দত্ত :
আজ ৪ নভেম্বর, কিংবদন্তি সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও বিপ্লবী রণেশ দাশগুপ্তের মৃত্যুবার্ষিকী। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে কলকাতার স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবন—সংগ্রামই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, কমিউনিস্ট রাজনীতি, সাংবাদিকতা, সাহিত্যচর্চা কিংবা মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন আপসহীন। ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে আদর্শকে বড় করে দেখা এই মানুষটি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের বিশ্বাসে অবিচল ছিলেন।
১৯১২ সালের ১৫ জানুয়ারি আসামে জন্মগ্রহণ করেন রণেশ দাশগুপ্ত। তাঁর বাবা অপূর্বরত্ন দাশগুপ্ত ছিলেন চাকরিজীবী ও ফুটবলার। কাকা নিবারণ দাশগুপ্ত ছিলেন গান্ধিবাদী এবং বিহার কংগ্রেসের সভাপতি। পারিবারিক রাজনৈতিক পরিবেশ থেকেই রাজনীতি ও স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে।
রাঁচিতে স্কুলজীবনেই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। ব্যায়ামাগারের প্রশিক্ষক হরিপদ দের সংস্পর্শে এসে বিপ্লবীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। জেঠাতো ভাই বিভূতিভূষণ দাশগুপ্তের অনুপ্রেরণায় যুক্ত হন অনুশীলন সমিতির সঙ্গে। তরুণ সংঘ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সংগঠক হিসেবে তাঁর পথচলা।
ছাত্রজীবন থেকে বিপ্লবী রাজনীতি
অনুশীলন সমিতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে বাঁকুড়া কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন রণেশ দাশগুপ্ত। পরে কলকাতার সিটি কলেজে ভর্তি হলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পুলিশের তৎপরতায় পড়াশোনা ব্যাহত হয়। এরপর বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হন। সেখানে কবি জীবনানন্দ দাশের পরিবারের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
পদ্মার ভাঙনে পৈত্রিকভিটা মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের গাউরদিয়া গ্রাম বিলীন হলে পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। সংসারের অভাব মেটাতে পড়াশোনা ছেড়ে সাংবাদিকতায় যোগ দিতে হয় তাঁকে। প্রথম চাকরি সোনার বাংলা পত্রিকায়। ম্যাক্সিম গোর্কির মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে লেখা একটি নিবন্ধ রণেশ দাশগুপ্তের লেখালেখির জগতে নতুন পথ খুলে দেয়।
ধীরে ধীরে বামপন্থী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ঢাকায় কমিউনিস্ট সংগঠন গড়ে তোলার পাশাপাশি অচ্যুত গোস্বামী ও সোমেন চন্দদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন প্রগতি লেখক সংঘ। সোমেন চন্দের হত্যাকাণ্ডের পর কিরণশংকর সেনগুপ্তের সঙ্গে সম্পাদনা করেন সংঘের মুখপত্র ‘প্রতিরোধ’।
কারাগারই হয়ে উঠেছিল ঠিকানা
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সাংবাদিকতার কারণে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে তাঁকে। ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান শাসনামল—দুই সময়েই কারাগারে কাটিয়েছেন দীর্ঘ সময়। মুক্তি পাওয়ার পর আবার গ্রেপ্তার, এমন অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। ১৯৫৫ সালে মুক্তির পর যোগ দেন দৈনিক সংবাদে। পত্রিকাটিকে প্রগতিশীল চিন্তার মুখপত্র হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কারাগারে মুনীর চৌধুরীকে ‘কবর’ নাটক লিখতে উদ্বুদ্ধ করেন তিনি। পরে কারাগারের ভেতর নাটকটি মঞ্চস্থ করার উদ্যোগেও ভূমিকা রাখেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ পালনের সময় আবার গ্রেপ্তার হন। ১৯৬২ সালে মুক্তি পেলেও একই বছর পুনরায় আটক হন।
১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর শহীদুল্লাহ কায়সার, সত্যেন সেনসহ একঝাঁক তরুণকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। উদীচীর মাধ্যমে অধিকার, স্বাধীনতা ও সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে যুক্ত থাকেন।
মুক্তিযুদ্ধ, নির্বাসন ও আদর্শের জীবন
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ভারতে চলে যান রণেশ দাশগুপ্ত। যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। কলকাতায় বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠন, সভা-সমাবেশে বক্তব্য এবং পত্রপত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
স্বাধীনতার পর দেশে ফিরলেও ১৯৭৫ সালের ১ নভেম্বর কলকাতায় একটি সভায় যোগ দিতে গিয়ে আর বাংলাদেশে ফিরে আসেননি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর এক ধরনের অভিমান থেকে কলকাতায় স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবন বেছে নেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানেই কাটে তাঁর।
অর্থকষ্ট ছিল নিত্যসঙ্গী। তবু আদর্শের সঙ্গে আপস করেননি । ‘আলো দিয়ে আলো জ্বালা’, ‘উপন্যাসের শিল্পরূপ’, ‘শিল্পীর স্বাধীনতার প্রশ্নে’সহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। অনুবাদ ও সম্পাদনার কাজেও রেখেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান। তাঁর জীবনযাপনে ছিল অনাড়ম্বরতা, কিন্তু চিন্তা ও আদর্শে ছিল দৃঢ়তা।
১৯৯৭ সালের ৪ নভেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন এই আজন্ম বিপ্লবী। তাঁর মৃত্যুতে থেমে যায় একটি জীবনের পথচলা, কিন্তু সংগ্রাম, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রেখে যাওয়া অবদান আজও স্মরণীয়। কারাগার, নির্বাসন কিংবা অর্থকষ্ট—কোনো কিছুই তাঁর আদর্শের পথচলাকে থামাতে পারেনি। মৃত্যুবার্ষিকীতে আপসহীন এই বিপ্লবীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au