বাংলাদেশ

দেশের ৮৪ শতাংশ কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাতে, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পান না স্নাতকদের বড় অংশ

  • 1:08 pm - November 04, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৫ বার
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আগেই বয়স্ক সমাজে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় হারের তুলনায় অর্ধেক। দেশের কর্মক্ষম মানুষের প্রায় ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। তাঁদের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ। এমনকি স্নাতক বা তার বেশি শিক্ষিত ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশের বেশি নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি না পেয়ে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব কাজে তাঁদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত কম।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ‘দক্ষিণ এশিয়ায় জনমিতিক পরিবর্তন: উন্নয়নের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি থেকে চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় দেশের কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর থেকে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত কমতে থাকবে এবং বাড়বে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। জনসংখ্যার এই বয়সভিত্তিক সুবিধা বা জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশের হাতে সময় খুব বেশি নেই। অথচ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখনো দুর্বল। ফলে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার আগেই বাংলাদেশ বয়স্ক সমাজে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের আঞ্চলিক অনুশীলন বিভাগের পরিচালক জেম মেতে, এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকা লিজেলোটে ওনসর্গ এবং বাংলাদেশ ও ভুটানের কার্যক্রম ব্যবস্থাপক গেইল মার্টিন।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মাঝারি ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট কর্মসংস্থানের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বড় একটি অংশ কাঙ্ক্ষিত ও নিরাপদ কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত আনুষ্ঠানিক চাকরির সুযোগ তৈরি না হওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে ছোট ব্যবসা বা বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছেন।

বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের অনানুষ্ঠানিক খাতের ৪৫ থেকে ৭০ শতাংশ উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, বিকল্প বা নিয়মিত চাকরি না পেয়ে তাঁরা এ ধরনের উদ্যোগ শুরু করেছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের অনানুষ্ঠানিক খাত জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক।

আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম। বাংলাদেশে এসব প্রতিষ্ঠানে বছরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর গড়ের তুলনায় বাংলাদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার অর্ধেক।

শ্রম উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতে প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রম উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় কম। বিশেষ করে পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন প্রতিষ্ঠানের তুলনায় শ্রমিকপ্রতি উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।

বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়বে

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪৫ সালে বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর তা কমতে শুরু করবে। অন্যদিকে বাড়তে থাকবে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। ২০৫১ সালের মধ্যে দেশের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি। তখন বাংলাদেশ বয়স্ক সমাজে পরিণত হবে।

কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পরও বাংলাদেশ কয়েক বছর জনমিতিক সুবিধা ভোগ করার সুযোগ পাবে। তবে এই সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো না গেলে সেই সুযোগ কাজে লাগানো কঠিন হবে। জনসংখ্যার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষম মানুষের ওপর নির্ভরশীল মানুষের চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার চাহিদাও বৃদ্ধি পাবে।

স্বাস্থ্যসেবায় শহর-গ্রামের বড় বৈষম্য

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার দুর্বল প্রস্তুতি ও শহর-গ্রামের বৈষম্যের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। দেশে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাত্র ২০ শতাংশ সেখানে কর্মরত। বিপরীতে শহরে চিকিৎসকের ঘনত্ব গ্রামের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি।

অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর প্রস্তুতিও সন্তোষজনক নয়। প্রয়োজনীয় সেবার সব উপাদান রয়েছে মাত্র ১৮ শতাংশ কেন্দ্রে। অর্থাৎ ৮২ শতাংশ কেন্দ্রেই এ ধরনের সেবা দেওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতি নেই। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম পাওয়া যায় মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ কেন্দ্রে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগযোগ্য ইনসুলিন এবং ৩৮ শতাংশে মেটফরমিন পাওয়া যায়। হৃদ্‌রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান একসঙ্গে রয়েছে ১ শতাংশেরও কম স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, জনসংখ্যার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তাও বাড়বে। কিন্তু এ খাতে বাংলাদেশের ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।

কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ

প্রতিবেদন প্রকাশের পর আয়োজিত প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ এবং বিশ্বব্যাংকের আঞ্চলিক অনুশীলন বিভাগের পরিচালক জেম মেতে। আলোচনা পর্ব সঞ্চালনা করেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যাঁ পেসমে।

জ্যাঁ পেসমে বলেন, বাংলাদেশের জনমিতিক সুযোগ কাজে লাগানো নির্ভর করছে এখন দেশটি কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর। ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা, তরুণদের শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষতা অর্জনে প্রশিক্ষণ এবং নারীদের কর্মসংস্থানের পথে থাকা বাধা দূর করা জরুরি।

নারী ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, জনমিতিক লভ্যাংশের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার শিক্ষা খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ নিশ্চিত করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়নকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সমাজের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কল্যাণের পাশাপাশি তাঁদের পরিচর্যা ও সার্বিক সহায়তার জন্য তাঁদের মা-বাবাকেও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে ‘জীবনচক্রভিত্তিক সুরক্ষা কৌশল’ গ্রহণ করেছে। এ কৌশলে নবজাতকের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি থেকে শুরু করে প্রবীণ নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে নীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকার এই সময় বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে এখনই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

এই শাখার আরও খবর

প্রাণীর সঙ্গে যৌনাচার, জামায়াত সমর্থক শিক্ষক রাইয়ান বাতেন গ্রেপ্তার

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় প্রাণীর সঙ্গে যৌন কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক রাইয়ান আবদুল বাতেন। বুধবার (৪ নভেম্বর) বিষয়টি জানাজানি হলে এ নিয়ে ব্যাপক…

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ১৬ আসনের মধ্যে ১২টিতে ডেমোক্র্যাটদের জয়

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ১৬টি আসনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হয়েছে। এতে ১২টি আসনে জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি…

যুক্তরাষ্ট্রের চার অঙ্গরাজ্যে প্রথমবারের মতো নারী গভর্নর পেতে পারে ৪ অঙ্গরাজ্য

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নতুন ইতিহাস গড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে চারটি অঙ্গরাজ্যে। এবারের নির্বাচনে জর্জিয়া, মিনেসোটা, টেনেসি ও ওহাইও প্রথমবারের মতো নারী গভর্নর পেতে পারে। এসব…

কারাগার থেকে স্বেচ্ছানির্বাসন, রণেশ দাশগুপ্তের বিপ্লবী জীবন

ভাস্কর দত্ত :  আজ ৪ নভেম্বর, কিংবদন্তি সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও বিপ্লবী রণেশ দাশগুপ্তের মৃত্যুবার্ষিকী। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে কলকাতার স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবন—সংগ্রামই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে…

১০ হাজার টাকায় ডাকাতদের হাতে বিক্রি, তিন দিন পর নদীতে মিলল শ্যামলের লাশ

নরসিংদীর রায়পুরায় নিখোঁজের তিন দিন পর নেসলে ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কর্মী শ্যামল চন্দ্র দাসের (৫২) মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। অভিযোগ উঠেছে, ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে নৌকার…

সোনম ওয়াংচুকের স্কুলের ক্লাস বন্ধের নোটিশ

ভারতের লাদাখের প্রখ্যাত প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক পরিচালিত একটি স্কুলের ক্লাস ও অন্যান্য কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে লাদাখ প্রশাসন। প্রয়োজনীয় অনুমোদন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au