বাংলাদেশ

শ্রমিক অসন্তোষে চাপে পোশাকশিল্প, সময়মতো পণ্য রপ্তানি নিয়ে শঙ্কা

  • 12:55 pm - November 06, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৬ বার
শ্রমিক অসন্তোষে চাপে পোশাকশিল্প, সময়মতো পণ্য রপ্তানি নিয়ে শঙ্কা।ছবি: সংগৃহীত

সাভার ও আশুলিয়ার পোশাক কারখানাগুলোতে কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষ, বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। একদিকে কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার চাপ, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠানোর বাধ্যবাধকতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার উদ্বেগ। সব মিলিয়ে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন পোশাকশিল্পের মালিকেরা। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশঙ্কা করছেন, উৎপাদন বন্ধ থাকার প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে গত ৩১ অক্টোবর থেকে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ এবং ছাঁটাই বন্ধের দাবিতে তাঁরা বিক্ষোভ শুরু করেন। ৫ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন চলে। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে।

শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে ৩১ অক্টোবর অন্তত ২৫টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ২ নভেম্বর শিল্প পুলিশের হিসাবে প্রায় ৪০টি কারখানা বন্ধ ছিল। পরদিন ৩ নভেম্বর শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। ৪ নভেম্বর বন্ধ কারখানার সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়ে যায়। ৫ নভেম্বর অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন শুরু হলেও ওই দিন অন্তত ৭০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ছিল।

সংঘর্ষে পুলিশের অন্তত ৫০ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম। আহতদের মধ্যে সহকারী পুলিশ সুপার শোয়েব আহম্মেদ এবং সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল আলম রয়েছেন। আহত হয়েছেন শ্রমিকেরাও। এ ছাড়া ৪ নভেম্বর হেমায়েতপুরে সংবাদ সংগ্রহের সময় পাঁচ সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী হামলার শিকার হন।

কারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনায় কয়েক দিনে আশুলিয়া থানা ও সাভার মডেল থানায় মোট আটটি মামলা হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোস্তফিজুর রহমান। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা সহস্রাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। প্রথমে ১১ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায় পুলিশ। পরে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে এক দিনে ৪০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানান ডিআইজি মোস্তফিজুর রহমান। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে আরও কয়েকজনকে আটকের তথ্য পাওয়া গেছে।

৫ নভেম্বর শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে শ্রমিকদের মজুরি, নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ পুরোপুরি কাটেনি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, শ্রমিকদের দাবির সমাধানের পাশাপাশি কারখানায় নিরাপদ ও স্বাভাবিক উৎপাদন পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

উৎপাদন বন্ধ থাকায় শিপমেন্ট নিয়ে উদ্বেগ

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু মনে করেন, কয়েক দিনের উৎপাদন বন্ধ থাকার প্রভাব পড়বে রপ্তানি পণ্য পাঠানোর সময়সূচিতে। বিশেষ করে ডিসেম্বরের বড়দিন সামনে রেখে অক্টোবর ও নভেম্বরের মধ্যেই অধিকাংশ রপ্তানি কার্যক্রম শেষ করার চাপ থাকে।

তিনি বলেন, আন্দোলনের কারণে কয়েক দিন পোশাক কারখানা বন্ধ থাকায় শিপমেন্ট নিয়ে চাপে পড়েছেন মালিকেরা। নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে মালিকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের আস্থাও কমতে পারে।

শ্রমিকদের দাবি ও মজুরি নিয়ে অসন্তোষ নিরসনে কারখানায় কার্যকর ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন খাইরুল মামুন মিন্টু। তাঁর মতে, শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনার সুযোগ থাকলে পরিস্থিতি সহিংস পর্যায়ে যাওয়ার আগেই সমাধানের পথ তৈরি করা সম্ভব হতো।

তিনি বলেন, কারখানায় কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন থাকলে শ্রমিকদের দাবি এবং মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম সম্পর্কে আগে থেকেই পরিষ্কার ধারণা দেওয়া যেত। এতে শ্রমিকেরা আইন অনুযায়ী শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতে পারতেন। কিন্তু কারখানায় অবাধ ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার না থাকায় পরিস্থিতি সহিংস পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ, শ্রমিকপক্ষ ও সরকারি প্রশাসনেরও ব্যর্থতা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে পোশাকশিল্পে ক্রয়াদেশ কমে আসা এবং দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা সমস্যার কথাও তুলে ধরেন খাইরুল মামুন মিন্টু। তাঁর ভাষ্য, কিছু কারখানা আগে থেকেই বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে আন্দোলনের কারণে উৎপাদন ও শিপমেন্ট ব্যাহত হওয়ায় শিল্পের সংকট আরও বাড়ছে।

তিনি বলেন, শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার এবং কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। মালিকেরা যাতে নিরাপদে উৎপাদন চালিয়ে পণ্য রপ্তানি করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ, পোশাকশিল্প বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লে এর প্রভাব শ্রমিকদের ওপরও পড়বে। বর্তমানে এ শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন। নতুন করে কারখানা বন্ধ হলে আরও অনেক শ্রমিক বেকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় শ্রমিকদের কাজে ফেরার পাশাপাশি তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন তিনি। খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, মজুরি নিয়ে শ্রমিকদের দাবি ও অসন্তোষ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। আপাতত উৎপাদন সচল রাখতে শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরা প্রয়োজন। তবে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক থাকলে কাজে ফেরা কঠিন হবে। তাই শ্রমিকদের বাড়িতে গিয়ে পুলিশি তল্লাশি বা হয়রানির অভিযোগের মতো পরিস্থিতি বন্ধ করে তাঁদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রমিক অসন্তোষের জন্য শ্রম আইন বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে শ্রম আইন বাস্তবায়ন না হওয়া এবং মজুরি বোর্ড গঠনে বিলম্বকে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, পোশাকশিল্পের মালিকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও প্রভাবের কারণে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে।

রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, পোশাকশিল্পের মালিকদের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিভিন্ন সময়ে একেকটি দল ক্ষমতায় আসে, অন্য দল ক্ষমতার বাইরে থাকে। মালিকদের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে শিল্পের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শ্রম আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতো না বলে মনে করেন তিনি।

মজুরি বোর্ড গঠন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মে মাসে বোর্ড গঠনের কথা থাকলেও বিষয়টি নিয়ে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সরকার ও তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতিকে (বিজিএমইএ) জানিয়ে আসছেন। নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলন চালানোর পরও মালিকপক্ষ দাবি না শোনায় শ্রমিকেরা মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছেন।

তবে আন্দোলনের মধ্যে ভাঙচুর ও নৈরাজ্যের ঘটনাগুলো শ্রমিকদের কর্মকাণ্ড নয় বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, কিছু সুবিধাবাদী ও স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি এসব ঘটনা ঘটিয়েছেন। শ্রমিকেরা নিজেদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত কারখানার ক্ষতি করতে চান না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর মজুরি দাবির বিষয়ে রফিকুল ইসলাম সুজন জানান, ৩৫টি শ্রমিক ফেডারেশন মিলে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০০ ডলার বা প্রায় ৩৬ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তাঁর উল্লেখ অনুযায়ী, নতুন বেতনকাঠামোয় একজন পিয়নের মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৩৮ হাজার ৪০০ টাকা নির্ধারণের বিষয়টি সামনে রাখা হয়েছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২০০৬ সাল থেকে পোশাকশিল্পে মজুরি বৃদ্ধির সময় এলেই মালিকদের একাংশ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। বিশেষ করে সাব-কন্ট্রাক্টের কাজ বন্ধ করে দিয়ে শ্রমিকদের বেশি মজুরি দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি থেকে বঞ্চিত করতে কিছু সুবিধাভোগী মালিকের উসকানিতে ভাঙচুর ও নৈরাজ্যের ঘটনা ঘটছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

শুধু বেতন বাড়ালেই জীবনমানের উন্নতি হবে না

শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সাভারের ওডিসি ক্রাফট প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক আবু বকর সিদ্দিক খান। তাঁর মতে, বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে বেতন বৃদ্ধির সুফল শ্রমিকেরা পুরোপুরি পাবেন না। একই সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

আবু বকর সিদ্দিক খান বলেন, পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। শুধু বেতন বাড়িয়ে শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার কারণে বর্ধিত বেতনের সুফল অনেক শ্রমিক পুরোপুরি পান না।

একজন নতুন শ্রমিকের বেতন ও ওভারটাইমের হিসাব তুলে ধরে তিনি বলেন, নতুন শ্রমিকের মূল বেতন সাড়ে সাত হাজার টাকা হলেও বাধ্যতামূলক দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজসহ মাস শেষে তিনি ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা পান। এর সঙ্গে হাজিরা বোনাসও যুক্ত হয়। তবে একজন নতুন শ্রমিককে কাজে দক্ষ করে তুলতে প্রথম তিন মাস প্রশিক্ষণ দিতে হয়। এ সময় তাঁর পেছনে অতিরিক্ত জনবল ও অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়।

আবু বকর সিদ্দিক খানের মতে, দেশের বাইরে অনেক প্রতিযোগী দেশের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। তাই শ্রমিকদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

কারখানা বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ বহন করতে হয় বলে জানান এই উদ্যোক্তা। তাঁর ভাষ্য, ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য তৈরি ও রপ্তানি করতে হয়। সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে পণ্য পাঠানোর চাপ থাকে। এ সময়ের মধ্যে আট দিন কারখানা বন্ধ থাকলে উৎপাদন ও শিপমেন্টের সময়সূচিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। এতে ক্রেতাদের আস্থা কমার পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ে।

তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের কারণে কারখানায় ভাঙচুর ও সহিংসতা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি কিংবা অন্য কোনো দাবি থাকলে মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও সরকারের সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। তাঁর দাবি, বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে।

শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে শিল্পাঞ্চলে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন আবু বকর সিদ্দিক খান। তাঁর মতে, গাজীপুর, টঙ্গী, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে বাড়ির ধরন অনুযায়ী প্রতি বর্গফুটের ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে।

পোশাকশিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমাতে কাঁচামাল আমদানি, পরিবহন, শুল্কসংক্রান্ত কার্যক্রম এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের মতো সমস্যার সমাধানও জরুরি বলে মনে করেন তিনি। শিল্পের টিকে থাকার স্বার্থে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো, উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকার, মালিক ও শ্রমিক সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

দেরিতে পণ্য পাঠালে বাড়তে পারে আর্থিক ক্ষতি

শ্রমিক অসন্তোষের কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয় বলে মনে করেন আশুলিয়ার প্রিজন সোয়েটারের পরিচালক গোলাম মুর্তুজা। তাঁর মতে, কোনো পণ্য আকাশপথে পাঠাতে না পারা কিংবা ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।

গোলাম মুর্তুজা বলেন, একটি পণ্য আকাশপথে পাঠাতে না পারলে কিংবা ক্রয়াদেশ বাতিল হলে ন্যূনতম দুই কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে।

এদিকে উৎপাদন বন্ধ থাকার প্রভাব শুধু দৈনিক উৎপাদন বা রপ্তানির পরিমাণ দিয়ে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল।

তাঁর মতে, উৎপাদন বন্ধ থাকলে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে, ক্রয়াদেশ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয় এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো সম্ভব না হলে ক্রেতাদের ছাড় দিতে হতে পারে। এসব ক্ষতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে।

মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বছরে ৪০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির লক্ষ্য থাকলে মাসে গড়ে প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করতে হয়। প্রতিদিন কয়েক শ পোশাক কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকায় সামগ্রিকভাবে বড় পরিমাণ উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আর্থিক ক্ষতির বাইরেও সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া, ক্রয়াদেশ নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়া এবং দেরিতে পণ্য পাঠানোর কারণে ক্রেতাদের ছাড় দিতে হওয়ার মতো বিষয়গুলো শিল্পের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে শ্রমিক অসন্তোষের তাৎক্ষণিক প্রভাব কাটিয়ে কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক করাই এখন পোশাকশিল্পের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই শাখার আরও খবর

খাগড়াছড়িতে আগুনে পুড়ল ৯ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ক্ষতি কয়েক কোটি টাকা

খাগড়াছড়ি পৌর এলাকার কলাবাগানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কাঠের দোকান ও আসবাবপত্র তৈরির কারখানাসহ নয়টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুড়ে গেছে। এ ঘটনায় একটি টমটম অটোরিকশাও আগুনে পুড়ে যায়। প্রাথমিকভাবে…

মধ্যরাতে সড়কে হোম ইকোনমিকসের ছাত্রীরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজধানীর গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্সের (সাবেক হোম ইকোনমিকস কলেজ) অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেছার পদত্যাগের দাবিতে মধ্যরাতে সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা।…

গঙ্গা চুক্তি নবায়নে নতুন শর্ত চাইতে পারে ভারত

বাংলাদেশের সঙ্গে ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ডিসেম্বর। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন করে পানি বণ্টনের শর্ত…

কারা নিয়ন্ত্রণ করছে দেশের মাদক সাম্রাজ্য

ভাস্কর দত্ত:  দেশের মাদক সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন এক হাজারের বেশি গডফাদার। তাঁদের অধীনে ইয়াবা, হেরোইন, আইস, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ মাদকের কারবার চালাচ্ছেন ২৫ হাজারেরও বেশি…

ইউরোপে এক দিনে ১২ ফ্লাইটে বোমা হামলার হুমকি

ইউরোপের বিভিন্ন দেশের যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে বোমা হামলার হুমকি ঘিরে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এক দিনেই অন্তত ১২টি ফ্লাইটে এ ধরনের হুমকি…

‘মেয়েকে মেরে ফেলেছি’ বলে শাশুড়িকে ফোন, পরে থানায় আত্মসমর্পণ

ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের চিক্কাবল্লাপুর জেলায় পারিবারিক বিরোধের জেরে ৩০ বছর বয়সী এক গৃহবধূকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে। হত্যার পর অভিযুক্ত নিজেই…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au