ইরানি কর্তৃপক্ষ অতীতেও সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জবাবে হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ করেছে। (রয়টার্স: মাজিদ আসগরিপুর/ওয়েস্ট এশিয়া নিউজ এজেন্সি/ফাইল)
ডেস্ক রিপোর্ট-
মেলবোর্ন ১৯ জুন- ইসরায়েলি বিমান হামলার মুখে ইরানের জনগণ যখন নিরাপদ স্থানে পালানোর চেষ্টা করছে, তখন দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মুখে পড়েছে তারা। ব্রিটিশ মানবাধিকার সংস্থা পরিচালিত ইন্টারনেট নজরদারি প্রতিষ্ঠান নেটব্লকস জানিয়েছে, ইরানে বৃহস্পতিবার (অস্ট্রেলিয়ান সময়) মধ্যরাত থেকে টানা ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, ইরানি কর্তৃপক্ষ দেশব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে, যার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে — ইসরায়েল নাকি সামরিক উদ্দেশ্যে নেটওয়ার্কটি ব্যবহার করছে। তবে বাস্তবে এটি জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার রুদ্ধ করছে বলে নেটব্লকস উদ্বেগ প্রকাশ করে।
ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের মাঝেই দেশটির রাজধানী তেহরানসহ বহু শহরে বোমাবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস বৃহস্পতিবার জানায়, ইরানে সংঘাতে মোট ৬৩৯ জন নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৬৩ জন বেসামরিক এবং ১৫৪ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। অপরদিকে, ইসরায়েলের দাবি—ইরানের পাল্টা হামলায় ২৪ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছে, সবাই বেসামরিক।

ইসরায়েলি হামলায় শত শত ইরানি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। (রয়টার্স: মাজিদ আসগরিপুর/ওয়েস্ট এশিয়া নিউজ এজেন্সি)
ইরানে অনেক সামরিক নেতা ও পারমাণবিক বিজ্ঞানী যারা দেশের পারমাণবিক কর্মসূচিতে যুক্ত ছিলেন, তাদের বাসভবনে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এসব ভবনের হামলায় সাধারণ মানুষও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হোয়াটসঅ্যাপ ডিলিটের নির্দেশে আতঙ্কিত নাগরিকরা
এ পরিস্থিতিতে ইরানি জনগণকে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাপ ডিলিট করতে বলা হয়েছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হোয়াটসঅ্যাপ উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে, যখন মানুষের সবচেয়ে বেশি যোগাযোগের প্রয়োজন, তখন এই মেসেজিং অ্যাপ বন্ধ করার চেষ্টা করা দুঃখজনক।
কেন বন্ধ ইন্টারনেট?
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাংক ক্রাইসিস গ্রুপ-এর ইরান প্রকল্প পরিচালক আলি ভায়েজ জানান, ইন্টারনেট বন্ধ করার একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে ইসরায়েলি সাইবার হামলার আশঙ্কা। এই হামলায় গোপন তথ্য ফাঁস বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বিকল হয়ে পড়তে পারে। তিনি আরও বলেন, “সরকার অভ্যন্তরীণ বা বিদেশ-উপলক্ষ্য আন্দোলন ঠেকাতেও যোগাযোগ সীমিত করতে পারে।”
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে “শাসন পরিবর্তনের” কথা বলেছেন। প্রথম দফা হামলার পর তিনি বলেন, “আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে ইরানিদের জন্য স্বাধীনতার পথ পরিষ্কার করছি। এই সরকার জানে না, কী আঘাত এসেছে, কী আসছে।”
অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই জানিয়েছেন, “যুদ্ধের জবাবে যুদ্ধ, বোমার জবাবে বোমা, আঘাতের জবাবে আঘাত — ইরান কোনো চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না।”
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট মোকাবেলায় টেক উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক এক্স (পূর্বে টুইটার) প্ল্যাটফর্মে জানান, তিনি ইরানে স্টারলিংক স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন চালু করেছেন। তবে ইরানে ইন্টারনেট আগে থেকেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং গণআন্দোলন দমন করতে ইন্টারনেট সীমিত বা বন্ধ রাখার নজির অতীতেও রয়েছে—বিশেষত ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর নারীদের অধিকার আদায়ের বিক্ষোভে।
এখন জনগণ একদিকে যেমন বোমার আঘাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে চায়, অন্যদিকে তথ্যবিচ্ছিন্ন অবস্থায় আত্মরক্ষাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ইরান যেন দুই ফ্রন্টে—একদিকে ইসরায়েলি আক্রমণ, আরেকদিকে নিজ সরকারের দমননীতির—চাপে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না।
