ইরানের আরাক শহরে অবস্থিত হেভি ওয়াটার রিয়্যাক্টর কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী। তবে এটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি।ছবি: ম্যাক্সার/ সরবরাহকৃত
লিখেছেন: জেমি সিডেল (অনুবাদ OTN Bangla)
মেলবোর্ন ২১ জুন- ইরানে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা এবং উপগ্রহ চিত্রে দেখা ইউরেনিয়াম সুবিধার ক্ষতি নতুন করে আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে: বাঙ্কার যদি ধ্বংস হয়, তাহলে আসলে কী মুক্ত হতে পারে?
স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে চেরনোবিল ও ফুকুশিমাকে
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে যে ইরানে হামলার প্রভাব শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক নয়, হতে পারে পরিবেশগতও। অনেকেই আতঙ্কের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন—রেডিয়েশন লেভেল বাড়ছে কি না।
কাতার জ্বালানি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে রেডিয়েশন পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা জোরদার করেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন:
আমাদের জন্য উপসাগরের পানি প্রধান উৎস। পারমাণবিক স্থাপনা বা জ্বালানি স্থাপনায় হামলা পুরো অঞ্চলের জন্য অজানা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।”
কোন কোন স্থাপনায় আঘাত?
ইরানে মাত্র একটি সক্রিয় পারমাণবিক রিয়্যাক্টর আছে, সেটি বুশেহরে। আর একটি ছোট গবেষণা রিয়্যাক্টর আছে তেহরানের কাছে। তবে ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াকরণ এবং গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে সারা দেশে, বেশিরভাগই মাটির গভীরে।
গত সপ্তাহে ইসরায়েল নাতাঞ্জ, ফোর্দো এবং আরাক—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হানে।
IAEA-এর মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি নিশ্চিত করেছেন যে অন্তত একটি স্থানে রেডিয়োঅ্যাকটিভ উপাদান ছড়িয়ে পড়েছে।

নাতাঞ্জ মাউন্ট কোলাং গাজ লা টানেল কমপ্লেক্স।
ছবি: সরবরাহকৃত
তিনি বলেন:
নাতাঞ্জে রেডিওলজিক্যাল ও কেমিক্যাল উভয় ধরনের দূষণ ঘটেছে। ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড, ইউরানিল ফ্লোরাইড এবং হাইড্রোজেন ফ্লোরাইডের মতো যৌগ সেখানে ছড়িয়ে পড়তে পারে।”
পারমাণবিক বোমা নয়, কিন্তু ঝুঁকি আছে
ইরানের লক্ষ্য ছিল ৯০% পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন। বর্তমানে তারা ৬০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ করেছে, যার পরিমাণ ৪০০ কেজি। তবে এটিকে অস্ত্রোপযোগী রূপে রূপান্তর করতে আরও জটিল প্রক্রিয়া ও প্রযুক্তি দরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টস-এর মুখপাত্র এডউইন লাইম্যান বলেন:
এই ধরনের ইউরেনিয়াম সাধারণত কম রেডিয়োঅ্যাকটিভ ঝুঁকিপূর্ণ, তবে ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড বাতাসের আর্দ্রতার সঙ্গে মিশে হাইড্রোফ্লোরিক অ্যাসিড তৈরি করতে পারে—যা তীব্রভাবে ক্ষতিকর।”
এই অ্যাসিড ত্বক, চোখ এবং শ্বাসনালী দিয়ে দেহে প্রবেশ করলে প্রাণঘাতী হতে পারে।

ছবি: ম্যাক্সার
আরাক রিয়্যাক্টরের হুমকি বেশি?
আরাকের হেভি ওয়াটার রিয়্যাক্টর আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হেভি ওয়াটার নিজে রেডিয়োঅ্যাকটিভ না হলেও এর ব্যবহারে প্লুটোনিয়াম ও ডিউটেরিয়াম তৈরি হতে পারে—দুটিই পারমাণবিক অস্ত্রের উপাদান।
উপগ্রহ চিত্রে দেখা যাচ্ছে নাতাঞ্জ স্থাপনাটির অধিকাংশ ওপরের কাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে মাটির নিচের সেন্ট্রিফিউজ কক্ষগুলো অক্ষত দেখালেও তা নিশ্চিত নয়। হঠাৎ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে বা বোমার কম্পনে এই যন্ত্রগুলো বিকল হয়ে যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি কী?
IAEA বলছে, ইনহেল বা ইনজেস্ট করলে ইউরেনিয়ামের আলফা কণার ঝুঁকি মারাত্মক। তবে সঠিক প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিলে এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
তবে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আরাক এবং অন্যান্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে আঘাতের ফলে রেডিয়োঅ্যাকটিভ ধ্বংসাবশেষ চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে—যা ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসরায়েলের এই হামলা কৌশলগতভাবে সফল হলেও, পরিবেশগত ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য ইতোমধ্যেই এক যুদ্ধের আগুনে জ্বলছে—এই রকম পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা সেই আগুনে নতুন করে ঘি ঢালার শামিল।
লেখক: Jamie Seidel (ফ্রিল্যান্স বিশ্লেষক)