পার্লামেন্ট ভবনের কাছেই পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন বিক্ষোভকারীরা । ছবি : বিবিসি
মেলবোর্ন, ৯ সেপ্টেম্বর- নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত ঘিরে ফুঁসে উঠেছে তরুণ প্রজন্ম। সোমবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানী কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছেন, নিহতদের মধ্যে রয়েছে মাত্র ১২ বছর বয়সী এক শিশু। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ।
কেন সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ হলো
সরকার সম্প্রতি ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার), ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামসহ মোট ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেয়। যুক্তি দেওয়া হয়, ভুয়া খবর, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও অনলাইন প্রতারণা ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ। একইসঙ্গে প্ল্যাটফর্মগুলোকে সরকারের কাছে নথিভুক্ত করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তবে কোটি কোটি তরুণ ব্যবহারকারী প্রতিদিন যেসব প্ল্যাটফর্মে খবর, বিনোদন ও ব্যবসা নির্ভর করতেন, সেগুলো হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ভিপিএন ব্যবহার করেও অনেকে সমস্যার সমাধান করতে পারেননি।
তরুণদের ক্ষোভের গভীর কারণ
যদিও প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে, তা দ্রুত রূপ নেয় সামগ্রিক রাজনৈতিক দুর্নীতি ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে।
- বিক্ষোভকারীদের হাতে দেখা গেছে প্ল্যাকার্ডে লেখা— “এনাফ ইজ এনাফ” (ঢের হয়েছে) এবং “এন্ড টু করাপশন” (দুর্নীতি খতম হোক)।
- ২৪ বছর বয়সী ছাত্র ইউজান রাজভান্ডারী বলেন, “শুধু সোশ্যাল মিডিয়া নয়, আমরা সর্বগ্রাসী দুর্নীতির বিরুদ্ধেও আন্দোলন করছি।”
- এক তরুণী ছাত্রী ইকশামা তুমরোক বলেন, “আমাদের আগের প্রজন্ম অবিচার সহ্য করেছে, কিন্তু আমরা চাই আমাদের প্রজন্মেই এর অবসান হোক।”
প্রথমে পার্লামেন্ট ভবনের সামনে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হলেও, পরে কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
- পুলিশ জলকামান, রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
- পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
- কাঠমান্ডুর বাণেশ্বর এলাকায় প্রথম কারফিউ জারি হলেও পরে তা সম্প্রসারিত হয়ে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ, প্রধানমন্ত্রী ও ভাইস প্রেসিডেন্টের বাসভবনসহ পুরো হাই-সিকিউরিটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
কেবল রাজধানী নয়, দেশের অন্য প্রান্তেও এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পোখরায় প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ে হামলা হলে স্থানীয় প্রশাসনও কারফিউ জারি করে।
নেপালের যোগাযোগমন্ত্রী পৃথ্বী সুব্বা বিবিসিকে বলেন, “পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে বল প্রয়োগ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।”
সরকার অবশ্য দাবি করছে, সোশ্যাল মিডিয়াকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার উদ্দেশ্য তাদের নয়; কেবল নেপালের আইন মেনে প্ল্যাটফর্মগুলো পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা।
তবে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর সরকারি সূত্র বলছে, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি এখন বিবেচনায় রয়েছে।
নেপালে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর বিধিনিষেধের ইতিহাস নতুন নয়। এর আগে টিকটক ও টেলিগ্রামের ওপরও সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল। কিন্তু এবার তরুণ প্রজন্ম সোশ্যাল মিডিয়া ব্যানের বাইরে গিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
ফলে নেপাল এখন একদিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মুখোমুখি, অন্যদিকে তরুণদের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিতে উত্তাল রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।
সুত্রঃবিবিসি