সারাদেশে বাড়ছে খুনের মতো গুরুতর অপরাধ
মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল- বাংলাদেশে খুনসহ গুরুতর অপরাধের হার সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে বিভিন্ন সরকারি পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে। পারিবারিক বিরোধ, মাদক…
মেলবোর্ন, ২৭ ডিসেম্বর- চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসন ও রাজনৈতিক চর্চায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। পোষ্য কোটা ইস্যুতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সংঘর্ষ, আওয়ামীপন্থি শিক্ষক ও ডিনদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক পোস্ট ও হুমকি এবং একের পর এক প্রশাসনিক অচলাবস্থার ঘটনায় কয়েক মাস ধরে অস্থির অবস্থায় রয়েছে এই ক্যাম্পাস। এসব ঘটনার অধিকাংশের সঙ্গেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি সালাহউদ্দিন আম্মারের নাম।
চলতি বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য ১০টি শর্তে পোষ্য কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২১ সেপ্টেম্বর বিকেলে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন প্রশাসন ভবন থেকে বের হওয়ার সময় শিক্ষার্থীরা তাঁর গাড়ি আটকে দেন। প্রায় ২০ মিনিট তাঁকে গাড়ির ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে তাঁর বাসভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় যখন উপ-উপাচার্য, প্রক্টরসহ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জুবেরী ভবনের সামনে উপস্থিত হন। সে সময় উপ-উপাচার্যকে ধাক্কা দিয়ে সিঁড়িতে ফেলে দেওয়া এবং উপ-রেজিস্ট্রার রবিউল ইসলামের দাড়ি ধরে টান দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ ওঠে, এসব কর্মসূচিতে সাবেক সমন্বয়ক ও বর্তমান রাকসু ভিপি সালাহউদ্দিন আম্মার নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এই ঘটনার প্রতিবাদে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম কর্মবিরতির ডাক দেয়। পরে অফিসার্স সমিতি ক্যাম্পাস শাটডাউন ঘোষণা করলে কয়েক দিন কার্যত অচল হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়। প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তিন মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। এ নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বেড়েছে।
এরপর আওয়ামীপন্থি ডিনদের পদত্যাগ এবং ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অপসারণের দাবিতে ‘অপারেশন জিরো টলারেন্স ফর ফ্যাসিজম’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন সালাহউদ্দিন আম্মার। গত ১৮ ডিসেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে তিনি ডিনদের পদত্যাগের জন্য সময় বেঁধে দেন। ২১ ডিসেম্বর ছয় ডিন ক্যাম্পাসে না থাকায় তিনি গণমাধ্যমের সামনে তাঁদের ফোন করেন এবং আগে থেকেই প্রস্তুত করা পদত্যাগপত্র প্রকাশ করেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামীপন্থি ডিনদের পদত্যাগের দাবিতে তিনটি অনুষদের ডিন কার্যালয়ে তালা লাগিয়েছেন রাকসু প্রতিনিধিরা। ছবিঃ সংগৃহীত
এরপর ডিনদের পদত্যাগের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস কমপ্লেক্স, প্রশাসন ভবনসহ একাধিক দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। দিনভর উত্তেজনার পর সন্ধ্যায় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকের পর সংশ্লিষ্ট ডিনদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এর আগে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুতে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে সালাহউদ্দিন আম্মারের বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। বক্তব্যে তিনি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উদ্দেশে কঠোর ও হুমকিমূলক ভাষা ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এই পরিস্থিতিতে বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের তিনটি সংগঠন ক্যাম্পাসে শিক্ষক নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম, ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এবং জিয়া পরিষদের নেতারা উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষক অবমাননা ও হেনস্তার ঘটনা বেড়েছে। এতে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিচার এবং জাতীয় নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ রাখার দাবি জানান।
নিরাপত্তা শঙ্কার কথা জানিয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী জাহিদ ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন। তিনি ২১ ডিসেম্বর নিজের ফেসবুক পোস্টে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
অন্যদিকে, আওয়ামীপন্থি ছয় ডিনের পদত্যাগের ঘটনাকে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার অপচেষ্টা হিসেবে দেখছে শাখা ছাত্রদল। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি দাবি করে, একটি কুচক্রী মহল পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পাসে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করছে। তাদের মতে, রাকসু ভিপির বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড অছাত্রসুলভ এবং জ্ঞানচর্চার পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।
ক্যাম্পাসের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী নোমান ইমতিয়াজ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনার জায়গা হলেও বর্তমানে সেখানে একাডেমিক পরিবেশ প্রশ্নের মুখে। জাতীয় রাজনীতির প্রভাব এতটাই বেড়েছে যে প্রশাসন ও ছাত্র সংসদ কেউই নিজ নিজ দায়িত্বে মনোযোগী নয়।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, মতাদর্শিক ভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে যদি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য উদ্বেগজনক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, এ মুহূর্তে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক বলা যাচ্ছে না।
সব অভিযোগের বিষয়ে রাকসু ভিপি সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, তিনি যা করছেন তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই করছেন। তাঁর দাবি, অধিকাংশ শিক্ষার্থী তাঁর কার্যক্রমকে সমর্থন করে। তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন এবং ক্যাম্পাসে থাকা সময়টুকু শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করেই যেতে চান।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au