অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে ২০২৫: অস্থিরতা, সংঘাত ও নাটকীয় ঘটনার বছর

  • 5:34 pm - December 31, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১০৬ বার
ফেডারেল নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজি ও বিরোধী দলনেতা পিটার ডাটন মুখোমুখি। ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৩১ ডিসেম্বর: ২০২৫ সাল অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে ছিল এক অভূতপূর্ব অস্থিরতা ও নাটকীয়তার বছর। বোরকা বিতর্ক থেকে সংসদের ভেতরে পচা মাছের কাণ্ড, নির্বাচনী লড়াই থেকে আন্তর্জাতিক টানাপোড়েন, রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি থেকে বছরের শেষে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা-সব মিলিয়ে দেশটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যেন এক অবিরাম রোলার কোস্টারে পরিণত হয়েছিল।

বছরের শুরুতেই কার্যত ফেডারেল নির্বাচনের ময়দান গরম হয়ে ওঠে। জীবনযাত্রার ব্যয়, বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসেবা ছিল প্রধান ইস্যু। বিরোধী দলনেতা পিটার ডাটন প্রতিশ্রুতি দেন, কোয়ালিশন ক্ষমতায় এলে দেশকে “আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা হবে”, আর প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ফিরিয়ে আনেন তাঁর পরিচিত স্লোগান-“অস্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যৎ গড়া”।

আলবানিজি ডাটনকে “কঠোর” ও “কদর্য” বলে আক্রমণ করেন, আর ডাটন পাল্টা জবাবে তাঁকে অস্ট্রেলিয়ার “সবচেয়ে দুর্বল প্রধানমন্ত্রীর একজন” বলে অভিহিত করেন।

নির্বাচনী প্রচারণা ছিল সমান নাটকীয়। আলবানিজ এক সমাবেশে মঞ্চ থেকে পড়ে গেলেও তা অস্বীকার করেন, আর পিটার ডাটন ভুল করে একটি ফুটবল ছুড়ে এক ক্যামেরাম্যানকে আহত করেন। এসব ঘটনার মধ্যেই ৩ মে ফেডারেল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শেষ পর্যন্ত লেবার পার্টি নির্বাচনে জয়ী হয় এবং অ্যান্থনি আলবানিজ পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে বিরোধী নেতা পিটার ডাটন ও গ্রিনস নেতা অ্যাডাম ব্যান্ড্ট সংসদ থেকে বিদায় নেন। লিবারেল পার্টির ইতিহাসে প্রথম নারী নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন সুসান লে।

আন্তর্জাতিক মঞ্চেও অস্বস্তি তৈরি হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত কেভিন রাড ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। একসময় ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করা এই দুই লেবার নেতা পরে তাঁকে সম্মান জানিয়ে উপস্থিত হওয়ায় দেশে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়।

দেশের ভেতরে ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক হামলার প্রেক্ষাপটে সরকার তথাকথিত “ঘৃণার গ্রীষ্ম” মোকাবিলায় জাতীয় ক্যাবিনেট ডাকার চাপে পড়ে। সমালোচকদের মতে, সরকারকে এই সিদ্ধান্তে আনতে “টেনে হিঁচড়ে” নিতে হয়েছে।

মার্চে চীনের যুদ্ধজাহাজ অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে ঘোরাফেরা করলে সরকার দুর্বলতার অভিযোগে পড়ে। একই সময়ে সংসদে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে গ্রিন পার্টির সিনেটর সারাহ হ্যানসন-ইয়াংয়ের সেই কাণ্ড, যখন তিনি তাসমানিয়ার স্যামন আইন নিয়ে একটি মৃত মাছ নিয়ে হাজির হন। এই দৃশ্য দেশজুড়ে হাস্যরস ও ক্ষোভ দুটোই তৈরি করে।

গ্রিনস সিনেটর সারাহ হ্যানসন-ইয়াং সিনেট অধিবেশনের সময় একটি মৃত স্যামন তুলে ধরে প্রতিবাদ জানান। ছবি: সংগৃহীত

সরকার সপ্তাহে মাত্র পাঁচ ডলারের করছাড় ঘোষণা করে, যা ভোটারদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও বাজেট ঘাটতি ও জাতীয় ঋণকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের পথে ঠেলে দেয়।

এরপর আসে আন্তর্জাতিক টানাপোড়েন। আলবানিজির চীন সফর সমালোচনার মুখে পড়ে, কারণ তিনি সামরিক মহড়া ও গোয়েন্দা তৎপরতার প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান। দেশে গাজা যুদ্ধ নিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। সরকার ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিলে ইসরায়েল তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।

একই সময়ে ইরানের সংশ্লিষ্টতায় অস্ট্রেলিয়ায় ইহুদিবিরোধী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের একটি ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যায়, যার পরিণতিতে ইরানি রাষ্ট্রদূতকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর মধ্যেই দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও তীব্র হয়ে ওঠে—সিনেটর জাসিন্তা প্রাইস অভিবাসন নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে ঝড় তোলেন, বব ক্যাটার এক সাংবাদিককে ঘুষি মারার হুমকি দিয়ে আলোচনায় আসেন, আর সাবেক ভিক্টোরিয়ান প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল অ্যান্ড্রুজ চীনের সামরিক কুচকাওয়াজে উপস্থিত হয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন।

ডিসেম্বরে সরকার ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে। এরপর এমপিদের ভ্রমণ ব্যয়ের কেলেঙ্কারি রাজনীতিকে নতুন করে নাড়িয়ে দেয়।

বছরের শেষদিকে বন্ডি বিচে ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ১৫ জন নিহত হলে পুরো অস্ট্রেলিয়া শোক ও আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যায়।

সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ১৪ ডিসেম্বর, যখন বন্ডাই বিচে ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর হামলায় ১৫ জন নিহত হন। এটি অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং দেশজুড়ে অভিবাসন, উগ্রবাদ ও ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়।

এই ট্র্যাজেডির পর নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রিমিয়ার ক্রিস মিন্স জনগণকে নববর্ষ উদযাপনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন,
“সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বড় জবাব হলো স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যাওয়া।”

২০২৫ সাল অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে রেখে গেছে গভীর অস্থিরতা ও বিভাজনের ছাপ, সঙ্গে একটি মৌলিক ও জরুরি প্রশ্ন- এই দেশ কোন পথে এগোচ্ছে, আর সেই পথ ভবিষ্যতের জন্য কী বার্তা বহন করছে। 

বছরের শেষের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট নয়; সন্ত্রাস মোকাবিলায় প্রয়োজন শক্ত গোয়েন্দা কাঠামো, কার্যকর সীমান্ত ও অভিবাসন যাচাই, উগ্রবাদ প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক আস্থা গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। সরকার যদি এসব ক্ষেত্রে বাস্তব, স্বচ্ছ ও কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা ও সামাজিক সংহতি ক্রমেই আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।

এই শাখার আরও খবর

বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের জন্য অভিবাসী ভিসা স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র

মেলবোর্ন, ২৫ এপ্রিল- বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা প্রদান সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব দেশের অভিবাসীদের মধ্যে…

অস্ট্রেলিয়া জুড়ে অ্যানজাক (ANZAC) ডে পালিত

মেলবোর্ন, ২৫ এপ্রিল: ২৫ এপ্রিল শনিবার অস্ট্রেলিয়া জুড়ে যথাযোগ্য মর্যাদা, নীরবতা এবং গভীর শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে অ্যানজাক (ANZAC) ডে। ভোরের প্রথম প্রহর থেকেই…

ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক পরিণতি, নিখোঁজ বৃষ্টিরও মৃত্যু

মেলবোর্ন, ২৫ এপ্রিল- যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ থাকা বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ থাকার পর শনিবার (২৫…

ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতির অপেক্ষায় ইসরায়েল

মেলবোর্ন, ২৫ এপ্রিল- ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে ইসরায়েল। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ উত্তেজনা ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা…

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত মানুষের ১০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশও

মেলবোর্ন, ২৫ এপ্রিল- বিশ্বজুড়ে তীব্র খাদ্যসংকট বা খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার চিত্র আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ-সমর্থিত এক নতুন বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষের…

“পৃথিবীতে আর কোনো যুদ্ধ নয়”- অ্যানজাক (ANZAC) ডেতে ভিয়েতনাম ভেটেরান গ্যারি

মেলবোর্ন, ২৫ এপ্রিল: আজ ২৫ এপ্রিল, অস্ট্রেলিয়া জুড়ে গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে অ্যানজাক (ANZAC) ডে। প্রতি বছর এই দিনটি অস্ট্রেলিয়া ও নিউ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au