শুক্রবার বিকেলে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিঃ ভিডিও থেকে নেয়া
মেলবোর্ন, ৩ জানুয়ারি- হবিগঞ্জে ছাত্রলীগ নেতা এনামুল হাসান ওরফে নয়নকে আটক করার প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের চাপের মুখে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার বিকেলে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। ভিডিওতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নেতাকে বানিয়াচং থানায় অগ্নিসংযোগ এবং এক পুলিশ সদস্যকে পুড়িয়ে হত্যার কথা বলতে শোনা যায়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহসভাপতি এনামুল হাসানকে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শায়েস্তাগঞ্জ থানা-পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে আসে। অভিযোগ ছিল, তিনি নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে গতকাল শুক্রবার দুপুর থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা এনামুলের মুক্তির দাবিতে থানা ঘেরাও করেন।
এক পর্যায়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র অধিকার আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসানের নেতৃত্বে একদল নেতা-কর্মী থানার ওসির কক্ষে অবস্থান নেন। তাঁরা দাবি করেন, এনামুল হাসান অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও পরে তিনি জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সে কারণে শুধু অতীত রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে তাকে আটক করা অন্যায়।
এই অবস্থান কর্মসূচির সময় শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালামের সঙ্গে মাহদী হাসানের তীব্র বাক্বিতণ্ডা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে মাহদী হাসানকে বলতে শোনা যায়, জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তারা সরকার গঠন করেছেন এবং পুলিশ এখন তাঁদের প্রশাসনের অংশ। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আটক করে আবার দরকষাকষির চেষ্টা করছে। এক পর্যায়ে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, “বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম। ওই জায়গা থেকে উনি কোন সাহসে বললেন আন্দোলনকারী হয়েছে তো কী হয়েছে।”
এই বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তা ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য দেওয়ার পরও কীভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিকেল তিনটার দিকে হবিগঞ্জ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শহীদুল ইসলাম শায়েস্তাগঞ্জ থানায় যান। তাঁর মধ্যস্থতায় বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে এনামুল হাসানকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে জানতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
ঘটনার পর মাহদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, আটক হওয়া ছাত্র নেতা একসময় ছাত্রলীগ করলেও জুলাই আন্দোলনে তাঁদের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন। শুধু অতীত রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই পুলিশ তাকে আটক করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কারী সারজিস আলমও তো একসময় ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাহলে তাকেও কি অপরাধী বলা হবে। মাহদীর দাবি, শায়েস্তাগঞ্জ থানা-পুলিশ এর আগেও তাঁদের তিন নেতা-কর্মীকে অন্যায়ভাবে আটক করেছে।
এদিকে আজ শনিবার সকালে হবিগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের বরাত দিয়ে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এনামুল হাসানকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছিল। পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ কারণে তাঁকে তাঁর অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালাম বলেন, এ ঘটনায় পুলিশের কোনো অপরাধ নেই। আটকের পর যা ঘটেছে, তা সবাই ভিডিওতে দেখেছে। পুলিশ কোনো বেআইনি কাজ করেনি এবং কেউ অপরাধ করলে অবশ্যই তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি আরও জানান, রাত বেশি হওয়ায় প্রথম দিন যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। পরদিন বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে দেখা যায়, আটক ব্যক্তি কোনো অপরাধে জড়িত নন। এরপর মুচলেকা নিয়ে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
এই ঘটনায় একদিকে পুলিশের ভূমিকা, অন্যদিকে প্রকাশ্যে দেওয়া সহিংসতার বক্তব্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।