বাংলাদেশ

আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

শেখ হাসিনা–পরবর্তী বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবেন বিএনপির তারেক রহমান?

  • 5:32 pm - February 10, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৪২ বার
জনসমাবেশে বক্তব্য রাখছেন তারেক রহমান। ছবিঃ আল জাজিরা

মেলবোর্ন, ১০ ফেব্রুয়ারি- রাত প্রায় বারোটা ছুঁই ছুঁই। কিন্তু গাজীপুরে তখনও মানুষের ঢল থামেনি। ঢাকার উত্তরে পোশাকশিল্পনির্ভর এই এলাকায় বিএনপির নির্বাচনী সমাবেশে জড়ো হয়েছেন কয়েক দশক হাজার মানুষ। অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন এক ব্যক্তির বক্তব্য শোনার জন্য। তিনি তারেক রহমান।

ডিসেম্বরে মা ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই সমাবেশকে বিএনপি নেতারা দেখছেন দলটির শক্তি পুনর্গঠন ও মাঠে ফেরার প্রমাণ হিসেবে।

গত ১৫ বছর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে দমন-পীড়নের শিকার বিএনপি এখন আবার ক্ষমতায় ফেরার লড়াইয়ে। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ও নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন গত বছর আওয়ামী লীগকে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করায় নির্বাচনের দৌড়ে বিএনপি এখন এগিয়ে আছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা সাবেক ছাত্রনেতাদের গড়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির সঙ্গে জোট করেছে।

দীর্ঘ প্রবাস শেষে দেশে ফেরা

যুক্তরাজ্যে প্রায় ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান। এরপর থেকেই তিনি বিএনপির নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। মঙ্গলবার প্রচার শেষ হওয়া পর্যন্ত তার সমাবেশগুলোতে বড় ভিড় দেখা গেছে।

১৭ বছর পর দেশে ফিরে ঢাকার বিশাল জনসমাবেশে হাত নেড়ে সমর্থকদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, দেশ গড়ার নতুন অঙ্গীকার নিয়ে। ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিন গ্রেপ্তার, দলীয় বিভক্তি ও ভোটারদের সঙ্গে দূরত্বের কারণে বিএনপি যে দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন দলটির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া, জনসম্মুখে উপস্থিত থাকা এবং সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হওয়া তারেক রহমানের বড় শক্তি। তার এই উপস্থিতি দলের তৃণমূলকে আবার সক্রিয় করেছে, যাদের রাজনৈতিক শিকড় তার বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই।

তবে এই উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি বাড়ছে অনিশ্চয়তা ও শঙ্কাও। ফলে এবারের নির্বাচন যেমন প্রত্যাশার, তেমনি সন্দেহেরও।

নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা

প্রায় ১৭ বছর লন্ডনে থেকে ভার্চুয়াল যোগাযোগ ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। দেশে ফিরে তিনি সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু সংগঠনের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এর বড় প্রমাণ, দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে না পারা। দেশের ৩০০ আসনের মধ্যে ৭৯টিতে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যাপক ও বিশ্লেষক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, অতীতে এমন বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা এত বেশি ছিল না।

এ ছাড়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১ শতাংশ ঘটনায় বিএনপির কর্মীরা জড়িত। এতে দলের ভেতরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, এবারের নির্বাচনী প্রচারে বিএনপির শৃঙ্খলাহীনতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রকাশ্যেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছেন, যা দলের বড় দুর্বলতা।

তিনি আরও বলেন, বাবা-মায়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তারেক রহমানের জন্য যেমন সুবিধা, তেমনি বাড়তি চাপও। খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের মতো নেতাদের ছাড়িয়ে যাওয়া সহজ নয়, আর সেই মাত্রার ক্যারিশমা তিনি এখনো দেখাতে পারেননি।

এই নির্বাচনই তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রথম বড় পরীক্ষা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আসন্ন নির্বাচনে তারেক রহমান দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এটিই তার প্রথম ইশতেহার। ছবিঃ সংগৃহীত

বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিতর্ক

তারেক রহমানের বক্তৃতাও সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ভুল তথ্য যুক্ত হওয়ায় অনিশ্চিত ভোটারদের আস্থা নষ্ট হচ্ছে।

ফরিদপুরের এক সমাবেশে তিনি দাবি করেন, ওই জেলায় ব্যাপক সয়াবিন উৎপাদন হয়। কিন্তু বাস্তবে সেখানে সয়াবিন চাষ খুবই সীমিত।

আরেক ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার প্রতিশ্রুতির একটি গ্রাফিক, যেখানে দেখা যায় অনেক প্রতিশ্রুতি আগেই বাস্তবায়িত হয়েছে বা ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়ের পুনরাবৃত্তি।

দলীয় নেতারা স্বীকার করছেন, বক্তব্যে ভুল হচ্ছে। তবে তাদের যুক্তি, দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় সময় লাগবে মানিয়ে নিতে।

দিলারা চৌধুরীর মতে, তার প্রস্তুতির ঘাটতি স্পষ্ট। ৫০ কোটি গাছ লাগানোর মতো প্রতিশ্রুতি বাস্তবসম্মত নয়।

নারী ও বেকারদের জন্য মাসিক ভাতা দেওয়ার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এই অর্থ কোথা থেকে আসবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে এর প্রভাব কী হবে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।

দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য নিয়েও সন্দেহ রয়েছে, কারণ বিএনপি নির্বাচনে ২৩ জন ঋণখেলাপিকে মনোনয়ন দিয়েছে।

সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এসব সমালোচনার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেন তারেক রহমান। তিনি অতীতের ভুল স্বীকার করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দেন।

তরুণ ভোটারদের আস্থা বড় চ্যালেঞ্জ

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা খান সোবায়েল বিন রফিক বলেন, ১৮ থেকে ২৬ বছর বয়সী তরুণ ভোটাররা বিএনপির শাসনকাল দেখেননি। তাদের মধ্যে বিএনপি মানেই দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির ধারণা গড়ে উঠেছে, যা ভাঙতে দলটি এখনো সফল হয়নি।

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের পরামর্শক থমাস কিয়ান বলেন, শেখ হাসিনার শাসনের মতো দমননীতি ফেরার সম্ভাবনা কম হলেও বিএনপির বিরুদ্ধে থাকা নেতিবাচক ধারণা এখনো তৃণমূলে প্রভাব ফেলছে।

আনুগত্য না যোগ্যতা

ঢাকায় এক অভিজাত হোটেলে বিএনপির ইশতেহার ঘোষণার সময় তারেক রহমান বলেন, সঠিক জায়গায় সঠিক মানুষ বসানো হবে। তবে বিশ্লেষক ও দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বাস্তবে তার প্রচার টিমে যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্যই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

দলীয় এক নেতা বলেন, লন্ডন থেকে আসা ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাই এখন বেশি প্রভাবশালী। ফলে দীর্ঘদিন দেশে থেকে আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা অনেক নেতা নিজেদের অবহেলিত মনে করছেন।

এর ফলে দলের ভেতরে দ্বন্দ্ব বাড়ছে, যা বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রশ্নে বিতর্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, তারেক রহমান এমন অবস্থানে আছেন যেখানে জিতলেও পুরো কৃতিত্ব পাবেন না, হারলে দায় তার ওপরই পড়বে।

তার রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু তার বংশপরিচয়। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সন্তান হওয়ায় তিনি একদিকে যেমন পরিচিত মুখ, অন্যদিকে তরুণদের একাংশ এই রাজনৈতিক বংশানুক্রম থেকে বের হতে চায়।

বিএনপি নেতৃত্ব বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার স্বাভাবিক বিষয়। যোগ্যতা ও জবাবদিহি থাকলে তা সমস্যা নয়।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে জনপ্রিয় হলেও দল হিসেবে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা বড় প্রশ্ন হয়ে আছে।

এই নির্বাচন তারেক রহমানের জন্য শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়। এটি এক ধরনের গণরায়, তিনি অতীত থেকে বেরিয়ে সত্যিকারের নতুন নেতৃত্ব দিতে পারবেন কি না, নাকি পরিচিত চক্রই চলবে নতুন নামে।

জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি বলেন, অতীতে অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুল হয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী। সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেন।

সূত্রঃ আল জাজিরা

এই শাখার আরও খবর

আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…

মুন্সীগঞ্জে হিন্দু নারী কবিরাজ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, প্রতিবেশী মীর হোসেন গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে হিন্দু নারী ও স্থানীয়ভাবে পরিচিত কবিরাজ রেখা রাণী রায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘদিন…

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে গ্রেপ্তার ৪, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন চারজন। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে আদালতে…

এশিয়ান কাপ শেষে ইরানে ফেরা নিয়ে শঙ্কায় নারী ফুটবলাররা, অস্ট্রেলিয়ায় সুরক্ষার দাবি জোরালো

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ: ২০২৬ নারী এশিয়ান কাপ খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা ইরানের নারী ফুটবল দলকে ঘিরে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী, ইরানি-অস্ট্রেলীয় কমিউনিটি এবং খেলোয়াড়দের অধিকার…

তেহরান ও ইসফাহানে ইসরায়েলের নতুন দফায় ‘ব্যাপক’ বিমান হামলা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের রাজধানী তেহরান ও গুরুত্বপূর্ণ শহর ইসফাহানে নতুন দফা ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী…

প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমা চাইলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট, হামলা স্থগিতের ঘোষণা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্দেশে দুঃখ প্রকাশ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, ইরানের অন্য কোনো দেশে আগ্রাসন চালানোর…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au