সমাধানের পথ নেই, বাংলাদেশের সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতি
মেলবোর্ন, ০৭ মার্চ- ইরানের সাথে ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের যুদ্ধে বাংলাদেশ নেই। কিন্তু সেই যুদ্ধের রেশ সবচেয়ে বেশি যেসব দেশে পড়েছে বাংলাদেশ তার…
মেলবোর্ন, ৬ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার প্রভাবে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কার মধ্যে দেশে তেল বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী একটি মোটরসাইকেলে দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে সর্বোচ্চ ১০ লিটার তেল দেওয়া যাবে। তেলের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া ও বাজারে আতঙ্ক কমানোর উদ্দেশ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
মোটরসাইকেল দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার।
প্রাইভেট কার দিনে সর্বোচ্চ ১০ লিটার।
এসইউভি বা জিপ ও মাইক্রোবাস দিনে ২০ থেকে ২৫ লিটার।
পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল।
দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দিনে ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল।
শুক্রবার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়, জ্বালানি তেলের সুষ্ঠু সরবরাহ বজায় রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় মজুত প্রতিরোধে সাময়িকভাবে তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা এসইউভি, যা সাধারণভাবে জিপ নামে পরিচিত, এবং মাইক্রোবাসে দিনে ২০ থেকে ২৫ লিটার পর্যন্ত তেল দেওয়া যাবে। পিকআপ বা স্থানীয় রুটে চলাচলকারী বাস দিনে ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে। অন্যদিকে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি তেল নিতে পারবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ব্যবহৃত মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে দেশের আমদানি কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে। বৈশ্বিক সংকটের কারণে অনেক সময় তেল আমদানির প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। চলমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি তেলের মজুত নিয়ে নানা ধরনের নেতিবাচক খবর ছড়িয়ে পড়ায় ভোক্তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এর ফলে অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনে রাখার চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বলছে, অতিরিক্ত চাহিদার কারণে ডিলাররাও আগের তুলনায় বেশি তেল ডিপো থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে কিছু ভোক্তা ও ডিলার প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে তা অননুমোদিতভাবে মজুত করার চেষ্টা করছেন বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব বিষয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তেল সরবরাহে এই সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ফিলিং স্টেশনগুলোতে নতুন কিছু নিয়মও চালু করা হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতিবার তেল কেনার সময় গ্রাহকদের রসিদ দেওয়া বাধ্যতামূলক থাকবে। রসিদে তেলের ধরন, পরিমাণ এবং দাম উল্লেখ করতে হবে। পরবর্তীবার তেল নেওয়ার সময় আগের রসিদ দেখাতে হবে। ডিলাররা বরাদ্দ অনুযায়ী তেল সরবরাহ করবে এবং গ্রাহকের রসিদ যাচাই করে তেল দিতে হবে। ফিলিং স্টেশনগুলোকে তাদের জ্বালানি তেলের মজুত ও বিক্রির তথ্য নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট ডিপোতে জানাতে হবে। এছাড়া ডিপো থেকে তেল দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ডিলারের বর্তমান বরাদ্দ ও মজুতের তথ্য পর্যালোচনা করা হবে এবং কোনো অবস্থাতেই বরাদ্দের চেয়ে বেশি তেল দেওয়া যাবে না বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিদেশ থেকে নিয়মিত চালান আনার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে। পাশাপাশি প্রধান স্থাপনা থেকে দেশের বিভিন্ন ডিপোতে রেল ওয়াগন ও ট্যাংকারের মাধ্যমে নিয়মিত তেল পাঠানো হচ্ছে। খুব শিগগিরই দেশে পর্যাপ্ত বাফার স্টক বা মজুত গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছে সংস্থাটি।
এদিকে নতুন নির্দেশনার মধ্যেই রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে শুক্রবার ছুটির দিনেও তেল নিতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। অনেক জায়গায় দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হয়েছে চালকদের। রাজধানীর পরীবাগ এলাকায় মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনের সামনে সকাল থেকেই মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। স্টেশনের সামনে থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের পাশ দিয়ে শাহবাগ মেট্রোরেলের নিচ পর্যন্ত গাড়ির সারি তৈরি হয়। দীর্ঘ লাইনের কারণে ওই সড়কে যানজটেরও সৃষ্টি হয়।
লাইনে দাঁড়ানোর ক্রম নিয়ে মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে কয়েক দফা তর্ক-বিতর্কের ঘটনাও ঘটে। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে কয়েকজন চালক কে আগে তেল নেবেন তা নিয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং পরে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
প্রায় ৫০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে পেরেছেন উবারচালক নাজমুল হাসান। তিনি জানান, শাহবাগ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর তেল নিতে সক্ষম হন। তিনি বলেন, এই সময়ের মধ্যে সাধারণত দুই থেকে তিনটি ভাড়া পাওয়া যেত। প্রতিদিন তার ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল লাগে। অন্য অনেকের হয়তো কম তেলে চলতে পারে, কিন্তু পেশাগত কারণে তার জন্য নিয়মিত তেল নেওয়া জরুরি।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্বেগের পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বেড়েছে। পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরানও। সংঘাতের প্রভাব বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত এখনো শেষ হয়ে যায়নি এবং আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত তেল আমদানি করা হচ্ছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবু অনেকে সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনে রাখার চেষ্টা করায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে হঠাৎ করে ভিড় বেড়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au