মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে পুরনো উদ্বেগ আবার সামনে চলে এসেছে। গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত একাধিক সহিংস ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন, মন্দিরে হামলা হয়েছে এবং পূজার সময় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে। মাত্র ১৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ব্যবধানে দুইজন হিন্দু নিহত হওয়া, হিন্দুদের জমি দখল এবং একটি মন্দিরে বিস্ফোরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনার পেছনে সরাসরি ধর্মীয় বিদ্বেষ, স্থানীয় বিরোধ, চাঁদাবাজি বা ব্যক্তিগত শত্রুতার মতো নানা কারণ থাকতে পারে। তবে একই সময়ে এমন একাধিক ঘটনা ঘটায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বগুড়ায় জমি বিরোধে হিন্দু যুবক হত্যা
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে চয়ন রাজভর (৪০) নামে এক হিন্দু যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার ফুলবাড়ি বাজার এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। এ সময় নিহতের ভাইসহ আরও দুজন আহত হন।
নিহত চয়ন রাজভর উপজেলার ফুলবাড়ি উত্তরপাড়ার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী মুচি সম্প্রদায়ের তুলারাম রাজভরের ছেলে। তিনি স্থানীয় ফুলবাড়ি বাজারে ‘দ্য নিউ কনটেস্ট’ নামে একটি কোচিং সেন্টারের পরিচালক ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফুলবাড়ি বাজার এলাকায় একটি জমি নিয়ে চয়ন রাজভরের সঙ্গে প্রতিপক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। শুক্রবার রাতে সেই জমি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তর্কবিতর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রতিপক্ষের শাহিন ফকির ও তাঁর ছেলেরা চয়ন রাজভরের ওপর হামলা চালান।
হামলাকারীরা একপর্যায়ে তাকে বুকে ছুরিকাঘাত করে। পরে স্থানীয়রা গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে সারিয়াকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
চয়ন রাজভরকে বাঁচাতে গিয়ে তার ভাই নয়ন রাজভরও গুরুতর আহত হন। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অপরদিকে প্রতিপক্ষের আমিনুর ফকিরও সংঘর্ষে আহত হয়েছেন।
সারিয়াকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আ ফ ম আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে জমি সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করা হয়েছে।
কক্সবাজারে চাঁদা না দেওয়ায় ব্যবসায়ী হত্যা
এর পরের দিন কক্সবাজারে চাঁদা না দেওয়ার অভিযোগে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। শনিবার দুপুরে কক্সবাজার শহরের বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন পল্লানকাটা এলাকায় তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।

চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা। ছবিঃ সংগৃহীত
পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। নিহত গণেশ পাল কক্সবাজার পৌরসভা মার্কেটের একজন ব্যবসায়ী ছিলেন।
তার ভাই আশীষ পাল জানান, সম্প্রতি পল্লানকাটা এলাকায় গণেশ একটি নতুন বাড়ি নির্মাণ করছিলেন। বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরুর পর থেকেই এলাকার কিছু যুবক রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে তার কাছে চাঁদা দাবি করছিল।
শনিবার সকালে দোকানে থাকার পর তিনি বাড়ির নির্মাণকাজ দেখতে সেখানে যান। পরে দুপুরের দিকে তাকে হত্যার খবর পাওয়া যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জিসান নামে এক চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং তার সহযোগীরা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে। জিসান ওই এলাকার মোহাম্মদ জাকিরের ছেলে এবং তার নেতৃত্বে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল এলাকায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর রাজবিহারী দাশ বলেন, দিনদুপুরে চাঁদার জন্য একজন ব্যবসায়ীকে হত্যা করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি দ্রুত তদন্ত ও জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছমি উদ্দিন জানিয়েছেন, নিহতের পরিবার চাঁদা না দেওয়ার কারণে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ করেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
মুন্সীগঞ্জে হিন্দু নারী হত্যার রহস্য উন্মোচন
এদিকে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে হিন্দু নারী এবং স্থানীয়ভাবে পরিচিত কবিরাজ রেখা রাণী রায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

কবিরাজ রেখা রাণী রায়। ছবিঃ সংগৃহীত
রেখা রাণী রায় (৬৫) সিরাজদীখান উপজেলার জৈনসার ইউনিয়নের চাইনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন এবং স্থানীয়ভাবে ভেষজ চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
গত বছরের ১৫ অক্টোবর বিকেলে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। পরদিন সকালে একটি ধানক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তখন তার হাত-পা গামছা দিয়ে বাঁধা এবং গলায় শাড়ি পেঁচানো ছিল।
দীর্ঘ তদন্তের পর পিবিআই গত ২ মার্চ রাতে তার প্রতিবেশী মীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। পরে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি হত্যার কথা স্বীকার করেন।
জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেন, দাঁতের ব্যথার চিকিৎসা নিয়ে ক্ষোভ এবং কবরস্থানে প্রবেশকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে তিনি রেখা রাণী রায়কে হত্যা করেন।
কুমিল্লায় মন্দিরে ককটেল বিস্ফোরণ
এদিকে কুমিল্লা নগরীতে একটি মন্দিরে শনিপূজা চলাকালে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নগরীর দক্ষিণ ঠাকুরপাড়া বাগানবাড়ি কালি গাছতলা শিব মন্দিরে এই হামলা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশ পরা এক ব্যক্তি ব্যাগ হাতে মন্দিরে প্রবেশ করে কিছুক্ষণ পর ব্যাগটি রেখে দ্রুত সেখান থেকে বের হয়ে যায়। পরে সেখানে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে।

এই ঘটনায় মন্দিরের পুরোহিত কেশব চক্রবর্তীসহ অন্তত চারজন আহত হন। আহতদের কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতাল ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পালিয়ে যাওয়ার সময় হামলাকারীরা পাশের বৌদ্ধ মন্দির ও একটি অফিসের সামনে আরও দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
কোতয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল আনোয়ার জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
খুলনায় জমি বিরোধে হিন্দু পরিবারের ওপর হামলা
খুলনার দৌলতপুরে জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে এক হিন্দু পরিবারের ওপর হামলা ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী সম্রাট বিষ্ণু থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়ে পরিবারের নিরাপত্তা চেয়েছেন।

খুলনায় জমি দখলে হিন্দু পরিবারের ওপর নির্মম হামলা। ছবিঃ ভিডিও থেকে নেয়াু
অভিযোগে বলা হয়, আদালতের স্থিতাবস্থার নির্দেশ অমান্য করে গত ৩ মার্চ অভিযুক্তরা বিরোধপূর্ণ জমিতে জোরপূর্বক নির্মাণকাজ শুরু করলে বাধা দিতে গেলে সম্রাট বিষ্ণুর ওপর হামলা করা হয়। পুলিশ গিয়ে কাজ বন্ধ করলেও পরে আবার নির্মাণের চেষ্টা করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারটি দ্রুত তদন্ত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
চট্টগ্রামে ১ দিনের ব্যবধানে দুই হিন্দু ব্যক্তি খুন
চট্টগ্রামে এক দিনের ব্যবধানে পৃথক ঘটনায় দুই হিন্দু ব্যক্তি নিহত হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। নিহতরা হলেন আকাশ দাস ও চন্দন দে।
বুধবার রাত (২৫ ফেব্রুয়ারি) নগরের আলংকার এলাকায় খেলনার কারখানার শ্রমিক আকাশ দাসকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শ্রমিকদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করা একটি চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাদের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়েছিল। সেদিন রাতে এক সহকর্মীকে রক্ষা করতে গেলে আকাশের ওপর হামলা চালানো হয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এর পরদিন বৃহস্পতিবার ভোরে (২৬ ফেব্রুয়ারি) চন্দনাইশ উপজেলার বাদুরপাড়া এলাকায় গরু চুরির সময় বাধা দিলে ৭০ বছর বয়সী চন্দন দেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। স্থানীয়রা জানান, সশস্ত্র একটি দল গরু চুরি করতে এসে তার ওপর গুলি চালায়।
দুই ঘটনায় স্থানীয়রা দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
নতুন করে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা
পরপর কয়েকটি ঘটনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা প্রশ্ন আবারও আলোচনায় এসেছে। মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে অনেক সময় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার পেছনে ধর্মীয় বিদ্বেষ, জমি বিরোধ, অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব বা স্থানীয় আধিপত্যের সংঘাত বড় ভূমিকা রাখে।
তবে একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে এমন ঘটনা ঘটলে তা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের শাস্তি এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগই পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে ঘিরে প্রশাসনের ওপর এখন চাপ তৈরি হয়েছে যাতে দ্রুত তদন্ত শেষ করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হয় এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা যায়।