মেলবোর্ন, ১৫ মার্চ : ইরানের নারী ফুটবল দলের আশ্রয় আবেদন ঘিরে চলমান নাটকীয়তার মধ্যে আরও তিন সদস্য তাদের আশ্রয় প্রার্থনা প্রত্যাহার করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অস্ট্রেলিয়াকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রপন্থী মহল অস্ট্রেলিয়াকে “ট্রাম্পের খেলার মাঠে অনুগত ও বোকা উপস্থিতি” বলে অভিহিত করেছে।
ইরানের দাবি, পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে এটি তাদের “প্রচারযুদ্ধে বড় জয়”। ইরানি নারী জাতীয় ফুটবল দলের আরও দুই খেলোয়াড় ও এক সাপোর্ট স্টাফ — মোনা হামৌদি, জাহরা সারবালি এবং জাহরা মেশকিনকার — আশ্রয় আবেদন প্রত্যাহার করে মালয়েশিয়া হয়ে ইরানে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
“এর আগেও আমাদের জাতীয় দলের আরেক খেলোয়াড় মোহাদ্দেসেহ জোলফি মাতৃভূমি ও ইরানের পতাকার প্রতি ভালোবাসা থেকে অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যাওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইরানের নারী ফুটবল দলের মেয়েদের জাতীয় চেতনা ও দেশপ্রেম এই দলকে ঘিরে শত্রুপক্ষের পরিকল্পনাকে পরাজিত করেছে, যা শত্রুভাবাপন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছিল।”
এর আগে মিডফিল্ডার মোহাদ্দেসেহ জোলফিও আশ্রয় আবেদন প্রত্যাহার করে দলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ নিয়ে ইরানের রাষ্ট্রপন্থী বিবৃতিতে বলা হয়, “আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার প্রকল্পের লজ্জাজনক ব্যর্থতা এবং ট্রাম্পের জন্য আরেকটি পরাজয়।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “মোনা হামৌদি, জাহরা সারবালি এবং জাহরা মেশকিনকার— জাতীয় নারী ফুটবল দলের দুই খেলোয়াড় ও কারিগরি দলের এক সদস্য— অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাহার করেছেন এবং বর্তমানে মালয়েশিয়া হয়ে পরিবার ও মাতৃভূমির উষ্ণ আলিঙ্গনে ফিরে যাচ্ছেন।”
তারা আরও উল্লেখ করে, “এর আগেও আমাদের জাতীয় দলের আরেক খেলোয়াড় মোহাদ্দেসেহ জোলফি মাতৃভূমি ও ইরানের পতাকার প্রতি ভালোবাসা থেকে অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যাওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইরানের নারী ফুটবল দলের মেয়েদের জাতীয় চেতনা ও দেশপ্রেম এই দলকে ঘিরে শত্রুপক্ষের পরিকল্পনাকে পরাজিত করেছে, যা শত্রুভাবাপন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছিল।”
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসঘনিষ্ঠ তাসনিম নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই সিদ্ধান্তকে পশ্চিমা প্রভাব প্রত্যাখ্যানের দেশপ্রেমিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক নিশ্চিত করেছেন, দলের কয়েকজন সদস্য দেশে ফিরে গেলে নিপীড়নের আশঙ্কা প্রকাশ করায় তাদের অস্ট্রেলিয়ায় থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, “অস্ট্রেলীয় কর্মকর্তাদের এ সিদ্ধান্ত জানানোর পর খেলোয়াড়দের তাদের সম্ভাব্য বিকল্প নিয়ে বারবার কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।”
তিনি আরও বলেন, “অস্ট্রেলীয় সরকার সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং তা জানাতে পারে, কিন্তু এমন অবিশ্বাস্য কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনের বাস্তবতাকে আমরা মুছে দিতে পারি না।”
টনি বার্ক বলেন, “অস্ট্রেলীয় সরকার যা কিছু সম্ভব ছিল, সবই করেছে যেন এই নারীরা অস্ট্রেলিয়ায় একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের সুযোগ পান।”
তার ভাষায়, “অস্ট্রেলীয়দের গর্বিত হওয়া উচিত যে আমাদের দেশেই এই নারীরা এমন এক রাষ্ট্রকে দেখেছেন, যেখানে তাদের সামনে সত্যিকারের বিকল্প রাখা হয়েছিল এবং সহায়তা দিতে আগ্রহী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করতে পেরেছেন।”
এই ঘটনার সূত্রপাত হয় গোল্ড কোস্টে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে ইরানের নারী দল— ‘লায়নেসেস’— জাতীয় সঙ্গীত না গাওয়ায়। বিষয়টি দ্রুত বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয় এবং তা ইরানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
ইরানের নারী দলের কোচ মারজিয়েহ জাফারি, যিনি পরে মুছে ফেলা একটি টেলিগ্রাম পোস্টে কথা বলেছিলেন, বলেন সম্প্রচার এবং এর পরবর্তী পরিস্থিতি খেলোয়াড়দের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
ইরান ফুটবল ফেডারেশনের প্রকাশিত তার বিবৃতিতে বলা হয়, “আমাদের মেয়েরা প্রথম ম্যাচে সৃষ্ট ভারী পরিবেশে প্রভাবিত হয়েছিল।”
তিনি আরও বলেন, “কিন্তু এর চেয়েও বড় ভুল করেছেন তারা, যারা দেশে বসে সেই পরিস্থিতি বুঝতে ব্যর্থ হয়ে এই দেশের কন্যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দিয়েছেন।”
জাফারির দাবি, ইরানে খেলোয়াড়দের উদ্দেশে দেওয়া হুমকিও এই সংকটে বড় ভূমিকা রেখেছে।
তিনি বলেন, “আমি নিশ্চিত, যদি ওই পরিবেশ তৈরি না হতো, তাহলে আমাদের একজন খেলোয়াড়ও অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যেত না।”
অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত ইরানি কমিউনিটির যেসব সংগঠন এই নারীদের সহায়তা করছে, তারা বলছে, খেলোয়াড়দের সামনে থাকা সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত কঠিন ও মানসিকভাবে ভীষণ চাপপূর্ণ।
সংকট চলাকালে সমর্থকেরা স্টেডিয়ামের বাইরে জড়ো হয়ে ঢোল বাজিয়ে “ওদের যেতে দাও” এবং “আমাদের মেয়েদের বাঁচাও” স্লোগান দেন।
কমিউনিটি সংগঠন আউসইরানের এক মুখপাত্র জানান, প্রথমদিকে সুরক্ষার আবেদন করা খেলোয়াড়দের একজন তাদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে ইরানে থাকা স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় প্রকাশ করেছিলেন।
বার্তাটিতে বলা হয়েছিল, “ইরানে আমাদের পরিবারগুলোকেই জিম্মি করে রাখা হয়েছে।”
সংগঠনটির দাবি, বিদেশে যাওয়া ইরানি ক্রীড়াবিদদের অনেক সময় এমন নথিতে সই করতে বাধ্য করা হয়, যাতে তাদের পরিবারের সম্পদ সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
মুখপাত্র বলেন, “সাধারণত তাদের এমন ফরমে সই করানো হয়, যার মাধ্যমে তাদের সম্পদ, ব্যবসা— সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ কার্যত সরকারের হাতে চলে যায়।”
তিনি আরও বলেন, “বিদেশে থাকাকালে তাদের জীবন মূলত শাসকগোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে।”
যদিও ইরানি কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বরং তারা উল্টো অভিযোগ করেন, অস্ট্রেলিয়া খেলোয়াড়দের দলত্যাগে প্ররোচিত করার চেষ্টা করেছে।
ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ অভিযোগ করেন, অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষ দলের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে এবং খেলোয়াড়দের অবাধে বের হতে দেয়নি।
ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত মন্তব্যে তিনি বলেন, “খেলার পর দুর্ভাগ্যজনকভাবে অস্ট্রেলীয় পুলিশ এসে হস্তক্ষেপ করে এবং আমাদের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, একজন বা দুজন খেলোয়াড়কে হোটেল থেকে সরিয়ে নেয়।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেশে ফেরার ফ্লাইটে ওঠার সময়ও দলটি বাধার মুখে পড়ে।
তাজ বলেন, “তাদের গেটে পুরোপুরি আটকে দেওয়া হয়েছিল এবং সবাইকে শরণার্থী হতে বলা হয়েছিল।”
অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে।
টনি বার্ক বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য ছিল প্রতিনিধিদলের প্রতিটি সদস্য যাতে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, “এই ব্যক্তিরা এমন এক সরকারের মুখোমুখি হয়েছেন, যারা বলেছে— সিদ্ধান্ত আপনার।”
আরও বলেন, “অস্ট্রেলীয় হিসেবে আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত যে আমরা এমনই একটি দেশ।”
যেসব সদস্য অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারা বর্তমানে কুইন্সল্যান্ডের একটি নিরাপদ স্থানে রয়েছেন। কর্মকর্তারা তাদের মানবিক ভিসাকে স্থায়ী মর্যাদায় রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। অন্যদিকে, দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রতিনিধিদলের সদস্যদের কুয়ালালামপুর হয়ে ইরানে ফেরার পথে ট্রানজিটে দেখা গেছে।