ইরান উপকূল থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে পারস্য উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত এই ছোট প্রবাল দ্বীপটি দেশটির তেল শিল্পের মূল ভিত্তি , ছবিঃ বিবিসি
মেলবোর্ন, ১৫ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পারস্য উপসাগরের খারগ দ্বীপ আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় এই ছোট দ্বীপটি এখন সামরিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত শনিবার (১৪ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম খারগ দ্বীপের সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে। তিনি এই হামলাকে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী বিমান হামলা হিসেবে বর্ণনা করেন।
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, তেহরানের খাতাম আল-আনবিয়া সামরিক কমান্ড সতর্ক করে বলেছে, ইরানের তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর যেকোনো হামলার জবাবে এই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন মিত্র বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করা তেল কোম্পানিগুলোর স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানো হবে।
খারগ দ্বীপটি পারস্য উপসাগরের উত্তরে, ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটি দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের বুশেহর প্রদেশের অংশ এবং আয়তনে প্রায় ২০ বর্গকিলোমিটার।
ছোট এই প্রবাল দ্বীপটি ইরানের তেল শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু। দেশটির অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই এখানকার তেল টার্মিনাল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হয়। বিশাল ট্যাংকারগুলো এখান থেকে তেল নিয়ে বিশ্ববাজারে যায় এবং অধিকাংশ সময় তারা গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে।
দ্বীপটিতে রয়েছে বড় আকারের তেল সংরক্ষণাগার, রপ্তানি টার্মিনাল, শ্রমিকদের আবাসন এবং একটি ছোট বিমানবন্দর। সমুদ্রতলের পাইপলাইনের মাধ্যমে ইরানের বড় বড় তেলক্ষেত্র থেকে অপরিশোধিত তেল এখানে আনা হয় এবং বিশাল ট্যাংকে সংরক্ষণ করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, খারগ দ্বীপ ইরানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের প্রধান সামুদ্রিক তেলক্ষেত্র আবু জার এই দ্বীপের পশ্চিমে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৮০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন হয়।
দ্বীপটিতে প্রায় ৪০টি তেল সংরক্ষণ ট্যাংক রয়েছে, যেখানে দুই কোটির বেশি ব্যারেল তেল মজুত রাখা সম্ভব। ফলে এটি ইরানের বৃহত্তম তেল সংরক্ষণ ও রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
ওয়াশিংটনের কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এই দ্বীপে হামলা চালানো বা এটিকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া গেলে ইরানের তেল রাজস্ব ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মার্কিন বিশ্লেষক মাইকেল রুবিন বলেন, খারগ দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হলে ইরান সরকারের তেল থেকে আসা রাজস্ব বন্ধ করার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা জ্যারেড অ্যাজেনও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি সম্পদ নিয়ন্ত্রণে এনে তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে চাইতে পারে।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, খারগ দ্বীপে হামলা বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাতের সূচনা করতে পারে। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা রিচার্ড নেফিউ বলেন, এই দ্বীপে হামলা বিশ্ব জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বীপের ওপর আঘাত হানলে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালাতে পারে কিংবা হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১৯৬০-এর দশক থেকেই খারগ দ্বীপ ইরানের তেল রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সে সময় মার্কিন তেল কোম্পানি অ্যামোকো-র অংশগ্রহণে এখানে তেল অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়।
আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরাক এই দ্বীপে একাধিকবার বোমা হামলা চালালেও অবকাঠামো দ্রুত মেরামত করে আবার সচল করা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বহু বছর ধরেই খারগ দ্বীপকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে একটি সংবেদনশীল “রেড লাইন” হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এই দ্বীপে বড় ধরনের ক্ষতি হলে শুধু ইরান নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারও বড় ধাক্কা খেতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা খারগ দ্বীপকে কীভাবে বিবেচনা করছে, সেটিই মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।